মে ০৬, ২০২১ ১৭:২২ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো প্রাচীন একটি প্রবাদের গল্প। প্রবাদটি হলো 'মূর্খের বন্ধুত্ব ভাল্লুকের সঙ্গেই থেকে গেল'। আমরা একটি প্রবাদের সঙ্গে কমবেশি পরিচিত। সেটি হলো 'অশিক্ষিত বন্ধুর চেয়ে শিক্ষিত শত্রু ভালো'।

এখানে অশিক্ষিত বলতে যিনি পড়ালেখা করেন নি সেরকম কাউকে বোঝানো হয় নি বরং যাদের জ্ঞান-বুদ্ধি কম তাদেরকে বোঝানো হয়েছে। আমাদের আজকের আসরের প্রবাদটি কিছুটা তারই পরিপূরক বলা যেতে পারে।

পশু পাখি মানুষের পক্ষ থেকে আস্থার একটু ইঙ্গিত পেলে কিংবা আদর-যত্ন পেলে খুব সহজেই অনুগত হয়ে পড়ে। যারা পশু-পাখি পোষেন তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন ব্যাপারটি। কুকুর, বেড়াল, কবুতর, ময়না, তোতাপাখি ইত্যাদি আরও বহু রকমের পোশা প্রাণীর মাঝে এই প্রবণতাটি সহজলক্ষ্য। এ ধরনের পোষা প্রাণীরা মনিবের ওপর আস্থা রাখে এবং মনিবের সেবায় তারা সবসময় নিবেদিত প্রাণ থাকে। কিন্তু এদের সবার তো বুদ্ধি নেই। সুতরাং মনিবের প্রতি ভালোবাসা আর আনুগত্য দেখাতে গিয়ে যদি এমন কোনো কাজ করে বসে যা আসলে মনিবের জন্য বিপজ্জনকই হয়ে দাঁড়ায় তা কিন্তু মনিবের বিরোধিতা নয় বরং তার অজ্ঞতা বৈ কি! আজকের প্রবাদটি ঠিক এরকমই একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে।

বর্ণিত আছে যে, অনেক অনেক বছর আগে অবিশ্বাস্য একটা ঘটনা ঘটেছিল। এক শক্তিশালী যুবকের ঘটনা। যুবকটি একদিন একটা প্রান্তর দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলো। মনের সুখে সে পথচলার সময় হঠাৎ তার কানে এলো বিকট একটা শব্দ। শব্দটা একদিকে যেমন ভয়ংকর অপরদিকে অপরিচিত। যুবকটি এদিক ওদিক তাকালো। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলো না। অগত্যা সে তার পথ ধরে এগুতে লাগলো সামনের দিকে। সামনে যেতেই তার নজরে পড়লো অবাক করা এক কাণ্ড। বিশাল এক অজগর সাপ মোটাতাজা একটা কালো ভাল্লুককে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে। আর ভাল্লুক বেচারা সাপের প্যাঁচ থেকে বাঁচার জন্য চেষ্টা করতে করতে গোঙাচ্ছে। তার ওই গোঙানির শব্দই এসেছিল যুবকের কানে।

অজগর যেভাবে পেঁচিয়ে ধরেছে ভাল্লুককে ওই প্যাঁচ থেকে ছুটে আসা কিছুতেই সম্ভব না ভালুকের। যুবক এই দৃশ্য দেখে মনে মনে কষ্ট পেলো। সে কিছুতেই ভালুকের এভাবে মৃত্যু হোক-তা চায় নি। অবশেষে যুবক সাপ আর ভালুকের কাছাকাছি এগিয়ে গেল। কোমর থেকে ঝুলন্ত তলোয়ার বের করলো এবং এক কোপেই অজগর সাপটিকে মেরে ফেললো। সাপের প্যাঁচ থেকে মুক্তি পেলো ভালুক। এই মুক্তির মানে প্রাণে বেঁচে যাওয়া। ভালুক যুবকের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞচিত্ত হয়ে গেল। ভালোও বেসে ফেললো সে যুবককে। তারপর থেকে শক্তিশালী ওই যুবক যখন যেদিকে যেত ভালুকও তার সঙ্গে সঙ্গে যেত ব্যক্তিগত প্রহরীর মতো। এভাবে দিন যেতে যেতে একসময় যুবকেরও ভালো লেগে গেল ভালুককে। পরস্পরে বন্ধু হয়ে গেল তারা।

একদিন ওই যুবক আবারও একটি প্রান্তর দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলো। যথারীতি ভালুকও তার পিছু পিছু পথ ধরলো। ওই প্রান্তর দিয়ে পার হচ্ছিলো অন্য লোকও। লোকটির চোখ পড়লো যুবক আর ভালুকের দিকে। অবাক হয়ে গেল লোকটি। যুবকের সঙ্গে সঙ্গে ভালুকও যাচ্ছে … কী কাণ্ড! কৌতূহলী হয়ে উঠলো লোকটি। যুবককে জিজ্ঞেস করলো: ঘটনা কী হে যুবক! আমি আমার জীবনে এরকম অদ্ভুত কাণ্ড কখনও দেখি নি-মানুষের সঙ্গে ভালুক একসঙ্গে পথ পাড়ি দিচ্ছে! যুবক হেসে দিয়ে ভালুকের পাশে দাঁড়ালো এবং তাদের বন্ধুত্বের পুরো ঘটনা খুলে বললো। লোকটি ঘটনা শুনে যুবককে উপদেশ দিলো: ভালুকের সঙ্গে বন্ধুত্ব গুটিয়ে ফেলে নিজের জাতের অন্য কাউকে বন্ধু বানাতে। আরও বললো: মূর্খের সঙ্গে বন্ধুত্ব মানে শত্রুর সঙ্গে বন্ধুত্ব।

যুবক ওই লোকের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো: তার মানে? ভালুকের সঙ্গে বন্ধুত্বে সমস্যা কী? বুঝতে পেরেছি তোমার হিংসা হচ্ছে। পথচারী লোকটি যতই বললো কোনো কাজ হলো না। উল্টো যুবক পথচারীর দিকে রেগেমেগে তাকিয়ে বললো: যাও যাও! নিজের পথ মাপো! আমি কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবো না করবো-সেটা আমার ব্যাপার! তোমার কী? নাক গলাতে এসো না! আপন চরকায় তেল দাও! পথচারী বেচারা যখন দেখলো যুবকের মনের পাথর কোনোভাবেই ভিজবে না-মনে মনে আফসোস করলো: অচিরেই বিপদে পড়বে যুবকটি!

এদিকে যুবক তার ভালুক বন্ধুকে নিয়ে ভালোই দিন কাটাচ্ছিলো। তাদের বন্ধুত্বও গভীরতর হলো। এরইমাঝে একদিন যুবক গেল বনে কাজ করতে। গাছ কেটে কেটে মাটিতে ফেলছিলো সে। কোজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেল। বনেই মাটির প'রে সটান শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। ঘুম এসে গেল যুবকের।

ক্লান্তিতে যুবক গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে গেল। ভালুক যখন দেখলো তার বন্ধু ঘুমিয়ে পড়েছে তার মাথার কাছে গিয়ে বসে পড়লো সে। হঠাৎ একটা মাছি এসে বসলো যুবকের কপালে। ভালুক পরপর দুইবার মাছিটিকে তাড়িয়ে দিলো। তৃতীয়বার যখন মাছি বসলো ভালুক রেগেমেগে মনে মনে বললো: দাঁড়া! আমার বন্ধুর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানো মজা দেখাচ্ছি তোকে! এমন শিক্ষা দেবো জীবনের জন্য উড়াল দেওয়া ভুলে যাবি! মূর্খ ভালুক যুবকের মাথার কাছ থেকে সরে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে দেখলো মাছিটি এখনও তার বন্ধুর কপালে বসে আছে। ভালুক এবার কুড়িয়ে আনা বিশাল একটি পাথর যুবকের কপালে ধাম করে মেরে দিলো মাছিটিকে মারার জন্য। ভালুক ভেবেছিলো শুধু মাছিটিই মরবে। কিন্তু ঘটলো বিপরীত। মাছি উড়ে গেল আর বন্ধু যুবকের কপাল, মাথা থেতলে গিয়ে মরে গেল সে।

সেই থেকে আমাদের আজকের প্রবাদটি চালু হয়ে গেল: 'মূর্খের বন্ধুত্ব ভাল্লুকের সঙ্গে'। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ০৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ