মে ০৬, ২০২১ ১৭:২২ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো প্রাচীন একটি গল্প। গল্পটি হলো 'সন্ত্রাসীর পরিণতি'।

সন্ত্রাস সাধারণত যারা করে তারা ক্ষমতাশালী হয় কিংবা ক্ষমতাবানদের সাহচর্য প্রাপ্ত হয়। পদস্থ লোকেরা আবার নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরীহ লোকদের ওপর জুলুম করে। তাদের অনুসারীরাও নিজ নিজ মহল্লায় অনুরূপ অত্যাচার চালায়, ত্রাস সৃষ্টি করে ইত্যাদি বিচিত্র উপায়ে লোকজনকে হয়রানি করে।

কর্মকর্তাদের ক্ষমতার দাপটে কেউ তাদের সামনে টু শব্দটিও করার সাহস পায় না। ত্রাসের রাজত্ব বলতে যা বোঝায় আর কি! সুতরাং কী আর করবে মানুষ। নীরবে সহ্য করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না জনগণের। সকল অত্যাচার মেনে নিয়ে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করাই তাদের একমাত্র উপায় হিসেবে অবশিষ্ট থাকে। কিন্তু এক মাঘে তো শীত যায় না বলে একটা কথা প্রচলিত আছে সমাজে। ব্যাপারটা কিন্তু মিথ্যে নয়। একবার যদি ওই অত্যাচারী কোনোরকম বিপদে পড়ে, অত্যাচারিত জনতা সেই সুযোগটিকে গনিমত বলে মনে করে প্রতিশোধ নিতে ভুল করে না।

বেশ প্রাচীন কালের কথা। কোনো এক শহরে এক ব্যক্তি বেশ উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিল। পদস্থ ওই কর্মকর্তা তার পদ-পদবীর অপব্যবহার করতো। ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে হয়রানি করতো। শহরে এমন কেউ ছিল না যে ওই লোকের দ্বামাধ্যমে হয়রানির শিকার হয়নি। আশ্চর্যের বিষয় হলো লোকটা মানুষকে হয়রানি করে আনন্দ উপভোগ করতো। কেউ কেউ সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তার অত্যাচারের প্রতিবাদ যে জানাতো না তা কিন্তু নয়। তবে ওই প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়া হতো আরও ভয়াবহ। ওই ভয়াবহতা দেখে লোকটির কোনো অত্যাচারের জবাব দেওয়া তো দূরের কথা না হয়রানির প্রতিক্রিয়া জানানো এমনকি হয়রানির বিষয়ে অভিযোগ করার পর্যন্ত সাহস করতো না। সবাই এভাবে তার অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন বিনা বাক্য ব্যয়ে সহ্য করতো। কারণ প্রত্যেকেই জানতো যে তার জুলুমের প্রতিবাদ করার মানেই হয়রানির শিকার হওয়া।

ক্ষমতাধর ওই সন্ত্রাসীর হয়রানিতে মানুষ যখন অতীষ্ঠ ঠিক সে সময় ওই শহরে এলো বেগানা এক দরবেশ। বেগানা বলতে ওই এলাকার লোক ছিল না ওই দরবেশ। সে কারণে দরবেশ ক্ষমতাধর সন্ত্রাসী লোকটির অত্যাচার সম্পর্কে কিছুই জানতো না। দরবেশ লোকটি এতোই নির্বিকার এবং সৎ ছিল যে তার সারা জীবনে কোনো একজন মানুষকে কষ্ট দেওয়া তো দূরের কথা একটা পিপড়াও কখনও তার হাতে কষ্ট পায় নি। কিন্তু দিন যেতে যেতে ঘটনাচক্রে ওই দরবেশ একদিন মুখোমুখি হলো বলদর্পী সেই দুষ্ট লোকটির।

দুষ্টু লোকটির সামনে পড়ে গেল ভিন শহরের দরবেশ। বেচারা দরবেশ তো জানে না লোকটির ব্যাপারে। সে তার মতো করেই শহরের ভেতর চলাফেরা করছিল। দরবেশের মাঝে কোনোরকম ভয়-ভীতি কিংবা তাজিম করার লক্ষণ দেখতে পেল না দুষ্টু লোকটি। এটা তার কাছে ঔদ্ধত্য বলে মনে হলো। সুতরাং লোকটি মনে মনে ভাবলো মজাই হবে! নতুন একটা উপাদান পাওয়া গেল খেলা করার। দরবেশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে সে বললো: আমার অত্যাচার নির্যাতন থেকে শহরের কেউ নিরাপদ থাকবে-তা কী করে হয়। অত্যাচার না করলে তো কেউ সালামও দেয় না, সম্মানও দেখায় না। সুতরাং এমন অত্যাচার করবো যাতে সবাই দেখামাত্র আমাকে তাজিম করে এবং ভয়ে ত্রস্ত হয়ে পতঙ্গের মতো কাঁপতে থাকে।

এই বলেই দুষ্টু লোকটি এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা পাথর খুঁজে হাতে তুলে নিলো এবং বেচারা দরবেশের মাথায় ছুঁড়ে মারলো। পাথরের আঘাতে দরবেশের মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে শুরু করলো। মাথায় হাত দিতেই দরবেশের হাত রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেল। সে দুষ্টু লোকটির দিকে অপলক তাকালো তার এই অবিবেচক কাজের প্রত্যুত্তর দিতে। কিন্তু জবাব দেওয়া আগেভাগেই দরবেশের পাশে থাকা লোকজনের মধ্য থেকে একজন সঙ্গে সঙ্গে দরবেশকে বাধা দিলো। বললো: জবাব দিও না! চুপচাপ চলে যাও! কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর দরকার নেই। অন্যরা দরবেশকে বোঝানোর চেষ্টা করলো এই দুষ্টু লোকটির চরিত্র কীরকম। দরবেশ বেচারা শেষ পর্যন্ত লোকজনের কথায় নীরব হয়ে গেল এবং যে পাথর দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়েছিল, ওই পাথরটি তার পকেটে পুরে নিলো।

পাথর পকেটে পুরতে দেখে দুষ্টু লোকটির কৌতূহল হলো। সে জানতে চাইলো দরবেশের কাছ থেকে: পাথর কেন পকেটে ঢুকিয়েছো? দরবেশ বললো: যে পাথরটি একজন নিরীহ দরবেশের মাথা পাঠিয়েছে সেই পাথরটি তো যা তা পাথর নয়। সুতরাং ওই পাথরটি সংরক্ষণ করাই উত্তম। হতে পারে কোনো একদিন কাজে দেবে। দুষ্টু লোকটি দরবেশের কথা শুনে অট্টহাসি দিয়ে মনে মনে বললো: কী আহাম্মক দরবেশ রে বাবা! এই পাথর কী কাজে লাগবে? এই ঘটনার পর কেটে গেল সপ্তা, মাস বছরের পর বছর। হঠাৎ একদিন ঘটলো আশ্চর্য একটা ঘটনা। দুষ্টু লোকটিকে দেখা গেল মাটির গভীরে একটি কূপে বন্দি অবস্থায়। খোজ খবর নিয়ে জানা গেল দুষ্টু লোকটি ভুলক্রমে একদিন ওই দেশের বাদশাহর অপছন্দের একটা কাজ করে বসেছিল, তাই বাদশার আদেশে তার এই শাস্তির আয়োজন।

অন্ধ কূপে বন্দি দুষ্টু লোকটি মানুষকে হয়রানি করার শাস্তি পেতে লাগলো। প্রতিদিন তাকে সামান্য একটু রুটি আর একটু পানি একটা পাত্রে দিয়ে রশিতে ঝুলিয়ে কূপের তলায় দেওয়া হতো খাবার হিসেবে। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, চারপাশের লোকজন থেকে দূরে একাকি এই নিভৃত কূপে নি:সঙ্গ কাটতে লাগলো তার দিন। তার এই পরিণতি দেখে দারুণ খুশি হলো লোকজন। তারা আনন্দে উৎসবে মেতে উঠলো। সেইসঙ্গে দোয়া করতে লাগলো: ওই কূপ থেকে যেন আর বেরুতে না পারে লোকটি। একদিন কূপের তলায়, অন্ধকারে বসে ছিল লোকটি। অতীতের দিনগুলোর কথা ভাবছিল। হঠাৎ তার মাথায় পড়লো একটা পাথর। সঙ্গে সঙ্গে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে শুরু করলো। অন্ধকারে হাতড়িয়ে সে পাথরটি খুঁজে বের করলো। মাথা তুলে চীৎকার করে বললো: কে তুমি পাথর ছুঁড়ে মেরেছো? কেন মেরেছো?

উপর থেকে শব্দ ভেসে এলো: আমি সেই নিরীহ দরবেশ যাকে তুমি একদিন বিনা কারণে মজা করার জন্য পাথর মেরে রক্তাক্ত করেছিলে। আমি সেই পাথরটি পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম আর তুমি উপহাস করেছিলে। মনে পড়ে? পুরো গল্প শোনার পর দুষ্টু লোকটির মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথা। বললো: মনে পড়ছে, পুরোপুরি মনে পড়ছে। কিন্তু এতদিন কোথায় ছিলে? দরবেশ বললো: তোমার ক্ষমতা আর পদমর্যাদার ভয়ে সেদিন কিছু বলতে পারি নি। আজ এই অন্ধকূপে পেয়ে মোক্ষম সুযোগ পেলাম এবং সুযোগটাকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সেদিনের সেই অন্যায়ের প্রতিশোধ নিয়ে নিলাম। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ