মে ৩০, ২০২১ ১৯:৩৫ Asia/Dhaka

গত আসরে আমরা শুনেছি 'সন্ত্রাসীর পরিণতি' নামে চমৎকার একটি প্রাচীন গল্প।

সন্ত্রাস সাধারণত যারা করে তারা ক্ষমতাশালী হয় কিংবা ক্ষমতাবানদের সাহচর্য প্রাপ্ত হয়। তাদের অনুসারীরাও নিজ নিজ মহল্লায় অনুরূপ অত্যাচার চালায়, ত্রাস সৃষ্টি করে ইত্যাদি বিচিত্র উপায়ে লোকজনকে হয়রানি করে। নীরবে সহ্য করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না জনগণের। কিন্তু এক মাঘে তো শীত যায় না বলে একটা কথা প্রচলিত আছে সমাজে। ব্যাপারটা কিন্তু মিথ্যে নয়। একবার যদি ওই অত্যাচারী কোনোরকম বিপদে পড়ে, অত্যাচারিত জনতা সেই সুযোগটিকে গনিমত বলে মনে করে প্রতিশোধ নিতে ভুল করে না।

গল্পটি আশা করি ভালো লেগে থাকবে আপনাদের। আজকের আসরেও আমরা একটি গল্প শুনবো। তবে এটি হলো প্রবাদের গল্প। 'হেসাব বে দিনার বাখশেস বে খারবর' অর্থাৎ 'হিসাবে পাই পাই দানে সীমা নাই'। যারা নিজেদের উত্তর প্রজন্মকে সচেতন করে তুলতে চান বিশেষ করে ধূর্ত ও অসৎ লোকদের প্রতারণা থেকে নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের রক্ষা করতে চান, তাদেরকে জীবনবোধ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দিতে চান তারা আজকের এই প্রবাদের গল্পটি মনোযোগ সহকারে শুনুন। ছোট্ট এই প্রবাদের গল্পটি আপনাকে শেখাতে পারে জীবনের অনেক বাস্তবতা।

সেই কোনো এক কালের কথা। কাল তো নির্বিকার। সে তার মতো চলতেই থাকে। কারও কথা শোনে না সে। তবে কোনো এক বাঁকে এমন কিছু ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটে যায় যেসব ঘটনা মাছ ধরার জালে মাছ আটকানোর মতো সময়ের জালে আটকে যায় তারা। সে কালের কোনো এক সময়ের সেরকম একটি গল্পের কথা বলছি। দুজন ভালো মানুষ ছিল সে সমাজে। তারা সবসময় চাইতো গরীব-ফকির অর্থাৎ অভাবী মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা করতে। এ কাজ করার জন্য তারা তাদের নিজস্ব মহল্লায় ঘুরে বেড়াতো। মহল্লার ধনী মানুষ যারা তাদের দরোজায় গিয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে কিছু টাকা-পয়সা সংগ্রহ করতো। ওই সংগৃহীত টাকা দিয়ে তারা গরীব ও অভাবী মানুষদের জন্য তাদের জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দিতো।

এলাকাবাসী ও প্রতিবেশিরা ওই দুই ভদ্রলোককে খুবই ভালো মানুষ মানে সমাজ সেবক ও কল্যাণকামী হিসেবেই জানতো। এ কারণে মহল্লার লোকজন তাদেরকে নিজ নিজ সামর্থ অনুযায়ী সহযোগিতা করতে দ্বিধা করতো না। যার পক্ষে যেটুকু দেওয়া সম্ভব ছিল দিতো তাদেরকে। এভাবে প্রতিবেশি গরীব ও অভাবী লোকদের জন্য ত্রাণ ও সাহায্য সংগ্রহের কাজ সুন্দরভাবেই চলছিল। এরকম সাহায্য সংগ্রহের কাজে একদিন ওই দুই ভদ্রলোক মহল্লারই এক প্রতিবেশির ঘরে গেল। তারা ত্রাণ ও অনুদান সংগ্রহের লক্ষ্যে প্রতিবেশির ঘরের দরোজায় টোকা দিতে চেয়েছিল কিন্তু দিতে ইতস্তত বোধ করলো। কারণ ঘরের ভেতর থেকে প্রচণ্ড হৈ চৈ-য়ের শব্দ কানে আসছিল তাদের।

ঘরের মুরব্বি সজোরে তার ছেলেকে বলছিলেন: আগামি এক সপ্তা তোর পকেটে কোনো কানাকড়ি দেওয়া হবে না। তখন বুঝবি টাকার মূল্য কী। আর মূল্য বুঝলে বেহিসাবি হবি না, টাকা উড়াবি না। ছেলে বললো: আমি কি জানতাম নাকি যে ওই দোকানদার বেশি দামে বিক্রি করে! আমি জানতে চাইলাম কত? সে বললো..অ্যাতো..! আমি সেই পরিমাণ টাকা বুঝিয়ে দিয়ে চলে এলাম। একই জিনিস যদি অন্য দোকানে আমার নজরে না পড়তো তাহলে তো বুঝতেই পারতাম না-আমি বেশি দামে কিনেছি। বাবা বললো: আগে কয়েকটা দোকানে দাম যাচাই করে তারপর কেনা উচিত। তুমি সোজা এক দোকানেই গেছো? দোকানদার যত দাম বললো তত দিয়ে চলে এসেছো? টাকাটা কি ভালুকের ঘাস যে যেমনে খুশি ওড়াবে?।

বাবা-ছেলের ঝগড়া এভাবেই চলছিল। সমাজসেবি ভদ্রলোকেরা একে অপরের দিকে তাকালো এবং একজন বললো: এই ঘরে মনে হয় টোকা না দেওয়াটাই ভালো হবে। মনে হয় না যে বাবা তার ছেলের সঙ্গে বেশি দামে জিনিস কেনার কারণে এরকম ঝগড়া করে, সে তার গরীব প্রতিবেশির জন্য দান-দক্ষিণা করবে। অপরজন বললো: কিন্তু এটা বোধ হয় আমাদের দায়িত্ব তার কাছ থেকেও সাহায্য চাওয়া, দেওয়া না দেওয়া তার ব্যাপার। অবশেষে তারা সিদ্ধান্ত নিলো ওই লোকের ঘরের দরোজায়ও টোকা দেবে। অবশ্য তারা যে কিছু পাবে-সে প্রত্যাশা কারুরই ছিল না। দরোজায় নক করলো এবং কিছুক্ষণ পর ঘরের মালিক দরোজা খুললো। প্রতিবেশিদের দেখে সে খুশি হয়ে গেল। সাহায্য সংগ্রহকারীরা তাদের কাজের কথা বিস্তারিত বর্ণনা করে বললো: এখন আপনার খুশি! চাইলে সাহায্য নাও দিতে পারেন আবার চাইলে সামান্য কিছু দিয়ে এই মহতী উদ্যোগে শরিক হতে পারেন।

মালিক দ্রুত ঘরের ভেতর চলে গেল এবং ফিরে এলো। মোটামুটি ভালো পরিমাণের টাকা সংগ্রাহকদের হাতে দিলো। সংগ্রাহকরা চিন্তাও করতে পারে নি এতো টাকা তাদেরকে দেবে। সে কারণে বিস্মিত হয়ে গেল তারা। একজন বললো: আপনাদের কথাবার্তা শোনার কোনো ইচ্ছে আমাদের ছিল না। কিন্তু কথাবার্তা এতো সরবে হচ্ছিল যে যে-কেউ এই পথ অতিক্রম করেছে শুনতে পেয়েছে। আমরাও আপনাদের বাপ-ছেলের কথা অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও শুনতে পেয়েছি। সে কারণে আমরা ভাবতেও পারি নি আল্লাহর পথে ব্যয় করার জন্য আপনি এতো বিশাল অনুদান দেবেন।

বাড়ির মুরব্বি হাসতে হাসতে বললো: আমি তো কৃপণতার কারণে ছেলেকে বকাবাদ্য করি নি। ওকে আমি জীবনের হিসাব নিকাশ শেখাতে চেয়েছি যাতে কেউ ঠকাতে না পারে। তার জানা উচিত খরচ করতে হবে প্রয়োজনমতো, আর অসহায়, গরীব, ফকিরদের দান করতে হবে সাধ্যমতো। ওই ঘটনার পর থেকে বলা হচ্ছে: "হিসাবে পাই পাই, দানে সীমা নাই"। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ৩০

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ