জুন ০৯, ২০২১ ১৯:১৪ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা একটি গল্প শুনবো অনুকরণের পরিণতি সম্পর্কে। গল্পটা এরকম: সবুজ শ্যামল চারণভূমি। পাহাড়ের ঢালে বিচিত্র ঘাসে ভরা। তারই পাশে হ্রদ।

একেবারে নীল স্বচ্ছ পানিতে ভরা। হ্রদের ওই নীল পানিতে পাহাড় আর সবুজ গাছগাছালির প্রতিচ্ছবি। দেখলেই মনে হবে যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা। ওই হ্রদে ছিল দুটি পাতিহাঁস আর একটি নিরীহ কচ্ছপের বাস। কচ্ছপের সাথে পাতিহাঁস দুটোর বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

দীর্ঘদিন একসাথে থাকতে থাকতে যা হয়। হাঁস দুটো পানিতে সাঁতার কাটতে কাটতে যখন ক্লান্ত হয়ে যেত তীরে উঠে এসে কচ্ছপের সাথে ভালো মন্দ সব বিষয়ে গল্প করে সময় কাটাতো। এভাবে তাদের কেটে গেল বহুদিন। এক বছর বৃষ্টিপাত কম হলো। হ্রদের পানি তাই কমে যেতে যেতে শুকিয়ে যাবার অবস্থা হলো। পাতিহাঁসের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো। তারা তো পানি ছাড়া বসবাস করতে পারে না। সে কারণে তারা সিদ্ধান্ত নিলো অন্য কোথাও, অন্য কোনো হ্রদে চলে যাবে। পাহাড়ের উল্টো দিকেই ছিল আরেকটা হ্রদ। সেখানে যাবে বলে মনস্থির করলো তারা।

পাহাড়ের উল্টো দিকের হ্রদে যাবার আগে তারা তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু কচ্ছপের সাথে দেখা করতে গেল। কচ্ছপকে তারা বললো: ‘যদিও আমরা এখানে একসাথে দীর্ঘদিন কাটিয়েছি কিন্তু এ বছর তো দেখছো হ্রদের পানি শুকিয়ে গেছে। আমাদের তো সমস্যা হয়ে গেল। পানি ছাড়া তো আমরা থাকতে পারবো না। তাই আমরা ভাবছি পাহাড়ের উল্টো দিকে যে হ্রদটা আছে সেখানে চলে যাবো। কিন্তু ভীষণ খারাপ লাগছে আমাদের তোমাকে ছেড়ে যেতে।’ কচ্ছপের মনটা ভেঙে গেল এ কথা শুনে। অশ্রুময় চোখে সে পাতিহাঁসদের বললো: তোমরা যদি আমাকে এখানে একা ফেলে যাও তাহলে আমি হার্ট অ্যাটাকে মারা যাবো। চেষ্টা করো এমন কিছু করতে যাতে একসাথে আগের মতো সবাই বসবাস করতে পারি।’

পাতিহাঁসেরা বললো: ‘আমরাও চাই তোমার সঙ্গেই থাকতে। এক বন্ধুকে ফেলে বসবাস করাটা দুষ্কর। কিন্তু কী আর করা। হ্রদ তো কয়েকদিনের মধ্যেই শুকিয়ে যাবে। পানি ছাড়া আমাদের খাবার দাবারের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে যাবে’। কচ্ছপ বিনয়ের সাথে বললো: প্রিয় বন্ধুরা আমার। তোমরা তো জানো, পানি ছাড়া আমার জন্যও বসবাস করা তোমাদের মতোই কঠিন। তাই বলি কী! তোমরা যেখানেই যাও আমাকেও তোমাদের সঙ্গে নিয়ে চলো। পাতিহাঁসেরা বললো: হে প্রিয় বন্ধু! আমরাও সেটাই চেয়েছিলাম যে তোমাকে এখানে একা রেখে যাবো না। কিন্তু আমাদের সঙ্গে কী করে তুমি পাড়ি দেবে। আমরা তো উড়াল দেবো। কিন্তু তুমি তো উড়াল দিতে পারবে না। তোমার জন্য ওই হ্রদটার দূরত্ব অনেক।

কচ্ছপ বললো: কোনো কাজই অসাধ্য নয়। তোমরা তো আমার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান। নিশ্চয়ই চিন্তাভাবনা করে একটা পথ বের করে ফেলতে পারবে। আমাকে যদি এখানে একা ফেলে রেখে যাও তাহলে কিন্তু বন্ধুত্বের অমর্যাদা করা হবে। একটা হাঁস বললো: সত্যি বলতে কী আমরাও ভাবছি হয়তো কোনো একটা উপায় বেরিয়ে যাবে তবে খুবই কষ্টসাধ্য হবে হয়তো। অবশ্য তোমাকে যতোটা জানি অতো কষ্ট তুমি হয়তো করতে পারবে না।

কচ্ছপ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো: কেন? আমার কোন দোষটার জন্য এভাবে বলছো তোমরা?

হাঁসেরা বললো: তুমি একটু অধৈর্য আর বেশি কথা বলো। আর তোমার আত্মবিশ্বসের অভাব আছে। নিজের প্রতি নিজের আস্থা কম। হুট করেই তুমি রেগে যাও। তোমাকে কেউ কিছু বললে যদি তোমার মনোপুত না হয় তুমি রেগেমেগে ঝগড়া শুরু করে দাও। তাছাড়া তুমি কে কী করছে সেটা জানার জন্য কৌতূহলী হয়ে পড়ো। তুমি এমনকি একটা মুহূর্তও চুপ করে থাকতে চাও না, স্থির থাকতে চাও না। যদি আমাদের সঙ্গে যেতে চাও তাহলে তোমাকে কিছু কিছু কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কচ্ছপ বললো: আমার ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তোমাদের ধন্যবাদ। নিজের দোষ সম্পর্কে সচেতন না হয়ে কেউ তা শোধরাতে পারে না। তোমরা দেখবে আমি কীভাবে নিজের দোষগুলো শুধরে নিয়েছি। আমি তোমাদের কথা দিচ্ছি তোমরা যেরকম ব্যবহার আমার কাছ থেকে আশা করো সেরকম আচরণই করবো।

কচ্ছপের দেওয়া কথার জবাবে পাতিহাঁসেরা বললো: আমরা তো তোমাকে বহুবার পরীক্ষা করেছি। তাতে আমাদের বুঝতে বাকি নেই যে তুমি তোমার কথা রাখতে পারবে না। তারপরও যেহেতু আমরা তোমাকে আমাদের সাথে রাখতে চাই, সেজন্য তোমাকে কথা দিতে হবে পুরো রাস্তায় তুমি একটি শব্দও করতে পারবে না। যদি এই কথা তুমি দিতে পারো তাহলে হয়তো আমরা সফল হতে পারি। কচ্ছপ বললো: এটা তো খুবই সহজ একটা শর্ত দিলে। শব্দ করা তো দূরের কথা,আমি প্রয়োজনে শ্বাস প্রশ্বাসও নেবো না। পাতিহাঁসেরা এবার বললো: মনোযোগের সাথে শোনো! এটা হলো এক টুকরো কাঠ। তুমি কাঠের মাঝখানে ভালো করে কামড়ে ধরবে।

আমরা কাঠের দুই প্রান্ত ধরে উড়াল দেবো। দ্রুতই আমরা চলে যাবে ওপাশের হ্রদে। কিন্তু মনে রাখবে লোকজন আমাদের দেখে হাসতে পারে এমনকি ঠাট্টাও করতে পারে। তুমি অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় সহ্য করবে,নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। একদম কোনো কথা বলবে না, এমনকি একটি শব্দও না।

কচ্ছপ মেনে নিলো। পাতিহাঁসেরা এক টুকরো কাঠ সংগ্রহ করলো। কচ্ছপ তার মাঝখানে কামড়ে ধরলো। হাঁসেরা দুই পাশ ধরে উড়াল দিলো গন্তব্যে। জনবসতিপূর্ণ গ্রাম পাড়ি দিলো তারা। গ্রামবাসীদের একজন তাদেরকে দেখে অন্যদেরকেও দেখালো। যে-ই দেখলো অবাক হয়ে গেল এবং এই দৃশ্য অপরকে দেখালো। অল্প সময়ের মধ্যেই চারদিকে গুঞ্জন উঠলো। কচ্ছপ ওই শোরগোল শুনে বিরক্ত হয়ে গেল। কিন্তু যেহেতু কথা দিয়েছে তাই চুপ করে থাকলো।     

কিছুক্ষণ কোনো কথাই বললো না। তবে মনে মনে ভাবলো: মানুষেরা কীরকম বে-ইনসাফ! একটা কচ্ছপকে উড়তে দেখে হিংসায় বাঁচে না তারা। পাতিহাঁসেরা উড়ছে আর কচ্ছপ ভাবছে আর ভাবছে। নীচে লোকজনও শোরগাল তুলছে। কচ্ছপের কানে ভেসে এলো একজনের কথা। বলছিলো: দেখো! কী অপূর্ব বন্ধুত্ব! আকাশেও তারা একসাথে উড়ছে। আরেকজন বললো: কচ্ছপ ভাবছে সে উড়তে পারছে। কচ্ছপ এবার আর সহ্য করতে পারলো না। চীৎকার করে বলে উঠলো: ‘হিংসুকদের চোখে ধুলা পড়ুক’। কথাটা বলতেই কাঠের টুকরো থেকে তার মুখ ছুটে গেল আর অমনি কচ্ছপ নীচে পড়ে গেল। অতো উপর থেকে পড়ে তার খোলস ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এবং মরে গেল। পাতিহাঁসেরা এই দৃশ্য উপর দেখলো। তারা কাঠের টুকরোটি ফেলে দিলো এবং নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালো।

পাতিহাঁসেরা নিজেদের মাঝে বলাবলি করছিলো: আমাদের দায়িত্ব ছিলো যথাযথভাবে উপদেশ দেওয়া, দিয়েছি। কিন্তু উপদেশ শোনার জন্য ধৈর্য আর নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়ের প্রয়োজন।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ০৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ