জুন ১৭, ২০২১ ১৬:১৪ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো প্রাচীন একটি প্রবাদের গল্প। 'গুরু মারা শাগরেদ' বলে একটা কথা প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। এর মানে হলো ধরা যাক কোনো একজন শিক্ষকের কাছে কোনো এক মেধাবি ছাত্র যে-কোনো বিষয়েই হোক জ্ঞান অর্জন করলো।

ওই মেধাবি ছাত্র আরও বেশি পড়ালেখা করে, গবেষণা চালিয়ে এমন পর্যায়ে চলে গেল যে তার শিক্ষকের চেয়েও কোনো কোনো ব্যাপারে নিজেকে সে বেশি জ্ঞানী ভাবতে শুরু করে দিলো। এ ধরনের ছাত্রের ব্যাপারেই বলা হয় গুরু মারা শাগরেদ।

এরকম এক শাগরেদের কাহিনী ঘিরে চালু হয়েছে একটি ফার্সি প্রবাদ: 'সূতো খাটো রাখতে হয়'। ওস্তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছাত্র কাজেকর্মে বেশ অগ্রসর হয়েছে ঠিকই। কিন্তু দ্রুততার দিক থেকে শিক্ষককে অতিক্রম করতে পারলো না ছাত্র। ছাত্র যতোই মনোযোগের সঙ্গে খেয়াল করলো তারপরও সময়ের ভেদটা কিছুতেই রফ্ত করতে পারলো না। বিখ্যাত সাহিত্যিক খলিল জিবরান বলেছিলেন: চিন্তা এবং কর্মের মাঝখানে বিরাট একটি ব্যবধান থাকে। ওই ব্যবধান দূর করতে অধ্যবসায়ী হতে হয়। এই উক্তিটির মতোই একটি কাহিনীকে ঘিরে আজকের প্রবাদটির সৃষ্টি হয়েছে। প্রবাদটি হলো: 'সূতো ছোট রাখতে হয়'। আমরা বরং আগে প্রবাদের গল্পটি শুনি। তারপর না হয় এ নিয়ে ভাবা যাবে।

সে অনেক দিন আগের কথা। এক শহরে বাস করতো এক দর্জি। দর্জি মানে টেইলার্স অর্থাৎ যারা জামা কাপড় সেলাই করে। ওই শহরের লোকজনের জাাম-কাপড় সেলাই করে যা পেত তা দিয়েই জীবন যাপন করতো সে। ওই দর্জির কাছে কাজ করতো এক ধূর্ত শাগরেদ। বছরের পর বছর ধরে দর্জির কাছে সে কাজ শিখেছে। মেধাবি হবার কারণে শাগরেদ খুব দ্রুতই ওস্তাদের কাজ সুন্দর করে ধরে ফেললো মানে ওস্তাদের মতো করেই জামা কাপড় সেলাই করতে শিখে গেল। সে যেসব জাাম-কাপড় সেলাই করতো সেগুলোর মান সেলাইয়ের দিক থেকে, ডিজাইনের দিক থেকে সর্বোপরি সৌন্দর্যের দিক থেকে কোনো অংশেই ওস্তাদের তৈরি জামার চেয়ে কম সুন্দর ছিল না। তবে একটা ব্যাপারে শাগরেদ কিছুতেই ওস্তাদকে অতিক্রম করতে পারলো না। সেটা হলো গতি। ওস্তাদ যে জামাটা এক সপ্তায় তৈরি করে কাস্টমারকে দিতে পারে সেই একই জামা তৈরি করতে শাগরেদের লেগে যায় দ্বিগুন সময় মানে দুই সপ্তার মতো।

শাগরেদ বহু চেষ্টা করলো ওস্তাদের এই গতির রহস্যটা আয়ত্ত্ব করার। কিন্তু যতোই সে মনোযোগ দিলো কিছুতেই কাজ হলো না। একদিন সে ওস্তাদকে এর রহস্য সম্পর্কে জিজ্ঞেসই করে বসলো: ওস্তাদ! আপনি কি আমার কাজকর্মে সন্তুষ্ট?

ওস্তাদ বললো: হুমম। তুমি তো ভালোই সেলাই করো!

শাগরেদ বললো: কিন্তু ওস্তাদ! একটা ব্যাপার আমি আয়ত্ত্ব করতে পারছি না।

ওস্তাদ জানতে চাইলো: কী বিষয়?

শাগরেদ বললো: আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আপনার সঙ্গে সময়ের দিক থেকে আমি কেন পেরে উঠতে পারছি না। আমার কাজের গতি আপনার মতো নয়। যে কাজ আমি দুই সপ্তায় করি সেই একই কাজ আপনি করেন এক সপ্তায়। কোথায় যে আমার ভুল হচ্ছে বুঝতে পারছি না।

কাজের গতির রহস্য সম্পর্কে ওস্তাদের কাছে জানতে চাইলে বললো: আমার কাজের গতির একটা রহস্য আছে সেটা তোমাকে এক্ষুণি বলবো না

শাগরেদ বললো: আপনি বললেন আমার কাজে আপনি সন্তুষ্ট; তাহলে আমার কাজের ভুল-ভ্রান্তি কিংবা আপনার কাজের গতির রহস্যটা কেন বলবেন না আমাকে?

ওস্তাদ জবাব দিলো: দেখছো না কতো ব্যস্ত আমি? কাস্টমারের ভিড়ও লেগে আছে? আমি তোমার কাজে সন্তুষ্ট কিন্তু তোমার ব্যাপার আমি এখনও নিশ্চিত নই, আস্থাবান নই আমার ভয় হচ্ছে তোমাকে আমার কাজের রহস্যটা বলে দিলে নাজানি কালই আমার দোকানের সামনে তুমি আরেকটা দোকান খুলে বসো! তখন দেখা যাবে কাজের গতিও তোমার ভালো, মানও ভালো, অভিজ্ঞতাও আছে সুতরাং আমার সব কাস্টমার তোমার কাছে চলে যাবে

শাগরেদ জানতে চাইলো: তাহলে কবে আমাকে রহস্যটা জানাবেন?

ওস্তাদ বললো: দেখা যাক! যখনই আমি মনে করবো আস্থা রাখা যায় বা বলার সময় হয়েছে, তখনই বলবো

এভাবে কেটে গেল কয়েক বছর শাগরেদ তো প্রতিদিনই অপেক্ষায় থাকে ওস্তাদের কাজের রহস্য জানার তার অবশ্য মোটেই নতুন দোকান খোলার চিন্তা ছিল না তবে কৌতূহল ছিল রহস্যটা জানার এই রহস্য জানার জন্য শাগরেদ ওস্তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে খুব আন্তিরকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছিলো অবশেষে একদিন ওস্তাদ অসুস্থ হয়ে পড়লো ডাক্তার বললো ওস্তাদ বুড়ো হয়ে গেছে, তার আয়ু ফুরিয়ে এসেছে ওস্তাদ একথা শুনে শাগরেদেকে কাছে ডেকে বললো: আমার তো আয়ু শেষ হয়ে এসেছে, তাই তোমাকে আমার কাজের রহস্যটা বলে যাবো শাগরেদ মনে মনে ভাবলো কী রহস্য জানি বলবে ওস্তাদ

শাগরেদ গুরুত্বপূর্ণ রহস্য জানার অপেক্ষায় কৌতূহলী হয়ে পড়লো। কিন্তু ওস্তাদ যে রহস্যের কথা বললো সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো না শাগরেদের কাছে। তার কাছে মনেই হলো না যে ওস্তাদের কাজের দ্রুততার কারণ এটা হতে পারে। ওস্তাদ বললো: তুমি যখন সেলাই করো তখন সূতো টানটান করে রাখো না! সূতোকে ছোটো রাখতে হয়!

শাগরেদ বললো: এটুকুই! কী বলেন, এতো সহজ ব্যাপারটা!

ওস্তাদ বললো: হ্যাঁ! এটুকুই। তুমি যখন সুঁইয়ে সূতো ঢুকাও তখন সূতা লম্বা রাখো এবং সেলাই করার সময় তুমি বারবার লম্বা সূতোটাকে কাপড়ের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করতে বাধ্য হও। সূতো যদি ছোটো রাখো তাহলে কম সময় লাগে সেলাই করতে।

সেই থেকে যখনই কেউ কাউকে তার কাজের মার্জিন কমাতে দ্রুততার কথা বলে তখনই এই প্রবাদটি উচ্চারণ করে: 'সূতোটা খাটো রাখতে হয়'। আসলে যে-কোনো কাজেরই কিছু কিছু রহস্য থাকে। সেই রহস্য অনেকেই ভাবে কতো গুরুত্বপূর্ণ বোধ হয়। অথচ দেখা যায় সামান্য একটু কৌশলেই বড় রকমের রহস্য লুকিয়ে থাকে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ