জুন ২৫, ২০২১ ২১:১৫ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি যে যেখানে বসে আমাদের অনুষ্ঠান শুনছো সবাই ভালো ও সুস্থ আছো। আজকের আসরে তোমাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশিদ এবং আমি আকতার জাহান।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, রাসূল (সা.)কে অনেক বাধা-বিঘ্ন ও ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করে ইসলাম প্রচার করতে হয়েছে। সকল ষড়যন্ত্র, জুলুম-নির্যাতন ও বাধা-বিঘ্নকে তিনি মোকাবেলা করেছে উত্তম আচরণ দিয়ে। আল্লাহপাক এ সম্পর্কে বলেছেন, 'আপনি যদি কঠোর ও নির্মম হতেন তাহলে তারা নিশ্চিতভাবে আপনার পাশ থেকে সরে যেত।' 

এ আয়াত থেকে সদাচরণের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। সদাচরণের কারণে মানুষ যেমন সফলতার মুখ দেখে, তেমনি তার মাধ্যমে বেহেশত লাভ করাও সহজ হয়। রাসূলেখোদা যেমনটি বলেছেন, ‘আল্লাহর ভয় এবং উত্তম আচরণ আমার উম্মতকে বেহেশতে দাখিল করবে।’

অন্যদিকে, নবী বংশের ষষ্ঠ ইমাম জাফর সাদেক বলেছেন, ‘দয়া ও নম্র ব্যবহার জমিনকে অধিক ফলনশীল করে এবং মানুষের আয়ু বৃদ্ধি করে।‘ তিনি আরও বলেছেন, ‘মানুষের সুখের একটা দিক হচ্ছে তার অমায়িক ব্যবহার।’

বন্ধুরা, উত্তম আচরণ বা অমায়িক ব্যবহারের গুরুত্ব সম্পর্কে জানলে। আজকের আসরে আমরা এ সম্পর্কেই কয়েকটি সত্য ঘটনা শোনাব। এছাড়া, একই বিষয়ে থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে প্রথমেই সত্য ঘটনাগুলো শোনা যাক।

 (রাসূলে আকরাম (সা.) ও এক আরব বেদুঈন)

একবার এক আরব বেঈদুন মদীনা শহরে এসে সোজা মসজিদে নববীতে চলে গেল। তার উদ্দেশ্য ছিল মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকে সোনা-দানা টাকা-পয়সা নেবে। সে সময় রাসুলেখোদা তাঁর সাহাবীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। বেদুঈন লোকটি মহানবীর সামনে এসে তার আরজ পেশ করল এবং তাকে কিছু দান করার জন্য আবেদন জানাল।

আল্লাহর নবী তাকে কিছু দান করলেন। কিন্তু তাতে সে সন্তুষ্ট হলো না। সে রাসূলের দানকে ‘সামান্য’ বলে গণ্য করল এবং কিছু বিশ্রী শব্দ ব্যবহার করে রাসূলের প্রতি বেয়াদবি করল। এ অবস্থা দেখে রাসূল (সা.)-এর সাহাবীরা প্রচণ্ড রেগে গেলেন এবং ওই লোকটিকে কঠিন শাস্তি দেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কিন্তু মহানবী তাদেরকে থামিয়ে দিলেন।

এরপর রাসূলে খোদা লোকটিকে সাথে নিয়ে তাঁর বাড়িতে গেলেন এবং তাকে আরো কিছু সাহায্য দান করলেন। এ সময় বেদুঈন লোকটি নিজের চোখে দেখতে পেলো যে, রাসূলে আকরামের জীবন ও অন্যান্য নেতা ও শাসকদের জীবনের অবস্থার মধ্যে কোনো মিল নেই। আর সে রাসূলের কাছে যে সোনা-দানা আশা করেছিল আসলেই তা তাঁর কাছে নেই।

বেদুঈন আরব এবার সন্তুষ্টি প্রকাশ করল এবং মুখে কৃতজ্ঞতার ভাষা উচ্চারণ করল। তখন মহানবী (সা.) আরব বেদঈনকে বললেন, ‘গতকাল তুমি আমার সম্পর্কে যেসব বিশ্রী কথাবার্তা বলেছ যা আমার সাহাবীদেরকে উত্তেজিত করেছে। তারা তোমার উপর খুবই অসন্তুষ্ট। এখন আমার ভয় হচ্ছে যে, তারা হয়তো তোমার কোনো ক্ষতি করে বসতে পারে। এখন তুমি আমার সামনে কৃতজ্ঞতার কথা বলেছ। এটা কি সম্ভব যে, তুমি তোমার এ কথাগুলো তাদের সামনেও বলবে যাতে তাদের রাগ দূর হয়ে যায়? জবাবে লোকটি বলল, ‘হ্যাঁ, এতে আমার কোনো আপত্তি নেই’।

পরদিন বেদুঈন লোকটি মসজিদে নববীতে গেল। যখন সবাই সেখানে সমবেত ছিলেন। রাসূল (সা.) তাদের দিকে ফিরলেন এবং বললেন, ‘হে লোকসকল! এ লোকটি বলছে যে, আমার প্রতি সে সন্তুষ্ট হয়ে গেছে। কি? এ কথা কি সঠিক?’

বেদুঈন লোকটি বলল,‘জ্বি, এটাই সঠিক।’ এ সময় আল্লাহর নবী (সা.) সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এ লোকটি আর আমার ঘটনাটির উদাহরণ হলো সে ব্যক্তির মতো, যার উট স্বীয় মালিকের প্রতি আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। আর লোকেরা উটের মালিককে সাহায্য করার উদ্দেশ্য নিয়ে শোরগোল শুরু করে দিল এবং সে পলায়নকারী উটটির পিছে পিছে দৌঁড়াতে লাগল। উটটি আরো আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত পালাতে লাগল। এ অবস্থা দেখে উটের মালিক সকল লোককে উদ্দেশ্য করে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ভাইসব! অনুরোধ করছি আমার উটের পিছনে কাউকে দৌঁড়াতে হবে না। আমার উটকে কিভাবে শান্ত করতে হয় সেটা আমি ভালো জানি।’

তার এ আহ্বান শুনে উটের পিছে দৌঁড়ানো লোকজন থেমে গেল। তারপর উটের মালিক এক মুষ্টি ঘাস নিজের হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে উটের কাছে পৌঁছে গেল। আর খুব সহজে উটের লাগাম নিজের হাতে নিয়ে নিল। উটটি তখন মালিকের সাথে ফিরে এলো।

এর পর নবীজি বললেন, ‘গতকাল যদি আমি তোমাদেরকে বারণ না করতাম তাহলে এ আরব বেদুঈনকে তার জীবন হারাতে হতো। তোমরা তাকে জীবিত ছেড়ে দিতে না। তাতে লোকটি কুফরি ও মূর্তি পূজারীর অবস্থায় মারা যেতো। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমি তোমাদেরকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেইনি। আর এখন তোমরা নিজেরাই দেখতে পেলে যে, আমি আমার ভালোবাসা ও নম্র ব্যবহার দ্বারা লোকটিকে একেবারেই মুগ্ধ করে ফেলেছি।’

বন্ধুরা, দেখলেতো! আল্লাহর রাসূল কিভাবে তার অমায়িক ব্যবহার দিয়ে লোকটিকে সৎপথে আনলেন! আসরের এ পর্যায়ে এ সম্পর্কেই রয়েছে একটি গান। গানটির কথা লিখেছেন জাকির আবু জাফর, সুর করেছেন মশিউর রহমান। আর গেয়েছে কিশোর শিল্পী মাহদী বিন আনিছ সিফাত।

(সিরিয়াবাসী এক ব্যক্তি ও ইমাম হোসাইন (আ.)

বন্ধুরা, এবার আমরা বিশ্বনবীর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (সা.)-এর অমায়িক ব্যবহার সম্পর্কে একটি সত্য ঘটনা শোনাব।

সিরিয়াবাসী এক ব্যক্তি একবার হজ কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশে মদীনায় আসল। মসজিদে নববীতে একদিন হঠাৎ তার নজর গিয়ে পড়ল এমন এক ব্যক্তির উপর যিনি মসজিদের এক কোণে বসেছিলেন। সে ভাবতে লাগল যে, এ লোকটি কে? কাছে দাঁড়ানো অপর একজনের কাছে জানতে চাইল, ‘এ লোকটি কে ভাই?’ সে বলল, তিনি হোসাইন ইবনে আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)’।

পূর্ব থেকেই ভিত্তিহীন মিথ্যা প্রচার-প্রপাগাণ্ডা তার মন-মগজকে ইমাম হোসাইনের বিরুদ্ধে বিগড়ে রেখেছিল। সুতরাং এ নামটি শোনার সাথে সাথেই ক্রোধ ও ক্ষোভে তার চেহারা লাল হয়ে গেল। আর ইমাম হোসাইনের বিরুদ্ধে গালি-গালাজের বৃষ্টি বর্ষণ করতে লাগল। অশ্রাব্য, বিশ্রী ও কুৎসিত শব্দ ব্যবহার করে সে ইমামকে গালি দিয়ে তার অন্তরের জ্বালা মিটাল এবং তার মনের ক্ষোভ-দুঃখ প্রকাশ করল।

ইমাম হোসাইন (আ.) তার গালাগালিতে মোটেও রাগ করলেন না, বরং অত্যন্ত ভালোবেসে ও সদ্ব্যবহারের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আল-কুরআনের সে আয়াতগুলো তেলাওয়াত করলেন, যে আয়াতগুলোতে ভালো ব্যবহার, ক্ষমা প্রদর্শন ও মার্জনা করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

কুরআনের আয়াতগুলো পাঠ করার পর ইমাম হোসাইন (আ.) সিরিয়ার অধিবাসী সে লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আমি তোমার যে কোনো খেদমত ও সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত আছি’। তারপর তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি সিরিয়ার অধিবাসী’?

জবাবে সে বলল, ‘হ্যাঁ! আমি একজন সিরিয়ার অধিবাসী’। তখন ইমাম তাকে বললেন, ‘সিরিয়াবাসীদের এরূপ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আমার আছে। আর আমি খুব ভালোভাবে জানি, এ দুর্ব্যবহার ও শত্রুতার কারণ কী? ’

এরপর ইমাম লোকটিকে বললেন, ‘তুমি এ শহরে একজন মুসাফির। বিদেশের বাড়িতে যদি তোমার কোনো কিছুর প্রয়োজন হয় তাহলে তুমি আমাকে বলো। আমি তোমার যেকোনো খেদমত করার জন্য প্রস্তুত আছি। আমি তোমাকে আমার মেহমান করতে চাই এবং তোমার যা লাগে তা দিতে চাই’।

সিরিয়াবাসী লোকটি তার দুর্ব্যবহার ও গালিগালাজের জন্য একটা কঠোর পরিণতির অপেক্ষা করছিল। সে এমনটি কখনোই আশা করছিল না যে, তার এ অপরাধ ও ধৃষ্টতা একেবারেই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হবে। ইমামের এ সুন্দর ব্যবহার তার মধ্যে এক আত্মিক বিপ্লব এনে দিয়েছে। সে নিজে নিজে বলতে লাগল, ‘আমার মন চায় যে, মাটি ফেটে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাক আর আমি তাতে ঢুকে পড়ি। হায় আফসোস! নিজের অজ্ঞতার কারণে আমি যদি এ অপরাধ না করতাম! এর আগ পর্যন্ত ইমাম হোসাইন (আ.) ও তাঁর পিতার চেয়ে বড় দুশমন আর কেউ ছিল না। আর এখন আমার দৃষ্টিতে ইমাম হোসাইন (আ.) ও তাঁর পিতার চাইতে অধিক প্রিয় আর কেউ নেই।’

বন্ধুরা, এবার আমরা ইমাম হুসাইন (.)'র পুত্র ইমাম জাইনুল আবেদিনের মহানুভবতা সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা শোনাব। ইমাম জাইনুল আবেদিন (.)-এর মূল নাম হল আলী। অত্যধিক সিজদার জন্য তিনি ইমাম সাজ্জাদ নামেও খ্যাত। 

একদিন ইমাম সাজ্জাদ (আ.) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে এক মজলিশে আলোচনা করছিলেন। এমন সময় হাসান ইবনে মুসান্না নামে এক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হয়ে ইমামকে অপমান করতে লাগল। ইমাম সাজ্জাদ লোকটির কথায় কিছু মনে করলেন না। লোকটি চলে যাওয়ার পর তিনি তার অনুসারীদের বললেন, ‘আমি লোকটার আচরণের জবাব দিতে চাই। আপনারা চাইলে আমার সাথে আসতে পারেন’।

ইমামের অনুসারীরা বললেন, ‘আমরা অবশ্যই আপনার সাথে যাব যদিও আমরা চেয়েছিলাম লোকটাকে উচিত জবাব দিয়ে দেই। কিন্তু আপনার অনুমতি না পেয়ে তাকে কিছু বলিনি।’ ইমাম বললেন, 'লোকটি আমার সাথে যে আচরণ করেছে তার জবাব আমাকেই দিতে হবে।'

এই বলে তিনি তার সাথীদের নিয়ে লোকটির বাড়ীর দিকে রওনা হলেন। বাড়ীতে পৌঁছার পর ইমাম ও তাঁর সাথীদের দেখে হাসান ইবনে মুসান্না তাদের মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তাকে দেখে ইমাম সাজ্জাদ বললেন, 'হে আমার ভাই! আপনি আমার কাছে গিয়ে কিছু কথাবার্তা বলেছেন। আপনি আমার সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন তা যদি সত্যিই আমার মধ্যে থাকে, তাহলে আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি আর আপনি আমার সম্পর্কে যা বলেছেন তা যদি আমার মধ্যে না থাকে তাহলে আমি আল্লাহর কাছে আপনার জন্য ক্ষমা চাইছি।'

ইমামের কথাগুলো লোকটির অন্তরকে নাড়া দিল এবং সে অনুতপ্ত হয়ে বলল, 'হে ইমাম! আমার ভুল ভেঙে গেছে। আমি আপনার ব্যাপারে যেসব অভিযোগ করেছি সেসব দোষ থেকে আপনি সম্পূর্ণ মুক্ত। আসলে আমিই আপনার প্রতি অন্যায় আচরণ করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন।'

লোকটির কথায় ইমাম খুশি হলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এ ঘটনার মাধ্যমে ইমাম তার অনুসারীদের শিক্ষা দিলেন, কিভাবে অন্যের ভুল উপেক্ষা করে তাকে ক্ষমা করে দিতে হয়। আমরা সবাই অন্যদের প্রতি ক্ষমাশীল হব এবং সবার সাথে ভালো ব্যবহার করব তাহলেই আমাদের সমাজ শান্তি-সুখে ভরে উঠবে।

বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে রয়েছে পল্লীকবি জসিম উদ্দিনের লেখা বিখ্যাত ‘প্রতিদান’ কবিতাটি। আবৃত্তি করেছে ঢাকার সারেগামা একাডেমির সদস্য কাজী আবদুর রাফি।

রাফির চমৎকার উচ্চারণে কবিতাটি শুনলে। তো বন্ধুরাতোমরা সবাই ভালো ও সুস্থ থেকো এ কামনা করে বিদায় নিচ্ছি রংধনুর আজকের আসর থেকে। কথা হবে আবারো আগামী আসরে।

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ