জুলাই ০৫, ২০২১ ২০:৩৯ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালো ও সুস্থ আছো। আজকের আসরে তোমাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশিদ এবং আমি আকতার জাহান।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই তেরশ শতাব্দীর বিখ্যাত ইরানি কবি ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মাওলানা জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমির নাম শুনেছো। তিনিই সম্ভবত মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় মরমি কবি। তাকে চেনেন না এমন কোনো মুসলিম শিক্ষিত ব্যক্তির অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না।

বিশ্ববিশ্রুত কবি জালাল উদ্দিন রুমির জন্ম হয়েছিল হিজরি ৬০৪ সালের ৬ রবিউল আউয়াল তথা ১২০৭ সনের ৩০ ডিসেম্বর। তাঁর জন্মস্থান ছিল প্রাচীন ও বৃহত্তর বালখ প্রদেশের বালখ্‌স নদী-সংলগ্ন একটি গ্রাম যেটি বর্তমানে তাজিকিস্তান, অথবা বর্তমান আফগানিস্তানের অংশ। রুমির পিতা বাহউদ্দিন ওয়ালাদ ছিলেন বালখ্-এর একজন ধর্মতাত্ত্বিক, আইনজ্ঞ এবং একজন সুফি সাধক। তিনি ছিলেন এই প্রদেশের সবচেয়ে বড় খতিব বা বক্তা যিনি রুমির অনুসারীদের কাছে ‘সুলতান আল-উলামা’ নামে পরিচিত।

রুমি তাঁর পৈতৃক দিক থেকে প্রখ্যাত সুফি সাধক নাজিম উদ্দিন কুবরা’র বংশধর ছিলেন বলে অনেকেই মনে করেন। তিনি তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় রুম সালাতানাতে কাটিয়েছেন। রুমি ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেছেন। তাঁকে তুরস্কের কৌনিয়া শহরে সমাহিত করা হয়।

মাওলানার রুমির একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে মসনবী। মাওলানা দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে মসনবী রচনা করেন। জীবনের অবসান পর্যন্ত তিনি এই লেখা অব্যাহত রাখেন। মসনবী হলো সমুদ্রের মতো সীমাহীন বিস্তৃত একটি গ্রন্থ। সমুদ্রের সম্পদের যেমন শেষ নেই তেমনি মসনবীর  রয়েছে নতুন নতুন মুক্তা।

আটশ বছর আগের এই গ্রন্থে কল্পনাভিত্তিক গল্প, রূপকধর্মী গল্প, রহস্যময় গল্প, আধ্যাত্মিক গল্প, শিক্ষণীয় গল্প, নৈতিক বা চারিত্রিক গল্প রয়েছে। আজকের আসরে মাওলানা রুমীর মসনবী থেকে একটি গল্প শোনাব। আর গল্প শেষে থাকবে কবিতা ও একটি গান। আমাদের আজকেরও অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।

মাওলানা জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি

প্রাচীনকালের ঘটনা। ইরানে তখন দরবেশদের আনাগোনা ছিল অহরহ একটি ব্যাপার। দরবেশদের জন্য তখন ইরানের বিভিন্ন এলাকায় খানকা বা সুফিদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা ছিল। সুফিরা যেহেতু শহর-গ্রাম সর্বত্র ঘুরে বেড়াতো তাই শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও এরকম খানকার ব্যবস্থা ছিল।

না, কেবল দরবেশ বা সুফিদের জন্যই নয় বরং অচেনা-অপরিচিত মুসাফিরদের জন্যও এই ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। তাই খানকাগুলো হয়ে উঠেছিল অনেকটা অতিথিশালার মতো। সুফি-দরবেশরা এইরকম অতিথিশালায় নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দিতে পারতেন বেশ কিছুদিন। তাদের জন্য থাকা-খাওয়ার নিরাপদ ব্যবস্থা ছিল এখানে।

এইসব খানকায় ঐতিহ্যগতভাবে একটা নিয়ম প্রচলিত ছিল। নিয়মটা হলো খানকায় আগে থেকে যারা অবস্থান করবে, তারা নতুন অতিথিদের স্বাগত বা অভ্যর্থনা জানাবে। তাদের আদর-আপ্যায়নের ব্যবস্থা করবে। কখন কী প্রয়োজন হয় তার দেখভাল করবে।

ওই সময় এক সাদাসিধে ও ভবঘুরে দরবেশ তার গাধায় চড়ে গ্রামে-গঞ্জে ও শহর-বন্দরে ঘুরে বেড়াতেন। সারাদিন পথ চলতেন আর রাত কাটাতেন কোন খানকায় বা পীর-ফকিরের দরগায়। এরকম কোন স্থান পাওয়া না গেলে এই ভবঘুরে ফকির কোন মসজিদ-মাদ্রাসায় রাত কাটাতেন।

একদিন এই দরবেশ গাধায় চড়ে ক্লান্ত এক গ্রামে এসে পৌঁছলেন। গ্রামে পৌঁছার পর তিনি লোকজনের কাছে জানতে পারলেন যে, কাছেই একটি জঙ্গলের ভেতর ফকিরদের একটি আস্তানা আছে। সংসারত্যাগী দরবেশ সেখানে গিয়ে দেখলেন, একদল ফকির-দরবেশ আসর জমিয়ে বসে আছে। আগন্তুক দরবেশ তার গাধাটি নিয়ে গিয়ে খোয়াড়ে বাধলেন এবং খানকার একজন খাদেমকে গাধাটি দেখাশোনা করার অনুরোধ জানিয়ে প্রবেশ করলেন ফকিরদের দরবারে।

নবাগত দরবেশকে দেখে আস্তানার দরবেশরা তাকে স্বাগত জানালেন। তাদের ব্যবহারে দরবেশ তার পথের ক্লান্তি ভুলে গেলেন এবং তাদের সাথে কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়লেন।

এদিকে আস্তানায় উপস্থিত গ্রাম্য মস্তানরা নবাগত দরবেশের গাধাটি দেখে মতলব আঁটতে লাগল। তাদের কয়েকজন এই দরবেশকে অন্য দরবেশদের চেয়েও বেশী সম্মান দিতে লাগল এবং তার সাথে গল্প-গুজবে মেতে উঠল। আর বাকীরা চুপি চুপি আস্তানা থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল। তারা খোয়াড় থেকে গাধাটি বের করে গ্রামের ভেতর এক পথিকের কাছে বিক্রি করল। তারপর গাধা বিক্রির পয়সা দিয়ে তারা ঐ রাতে মরমি সঙ্গীতের আসরের জন্য প্রয়োজনীয় সকল সামগ্রী কিনল, এমনকি রাতের খাবার-দাবারসহ রাত্রি জাগরণের জন্য যা যা লাগে সবকিছুর আয়োজন করলো।

নবাগত ফকির ভীষণ ক্লান্ত ছিল। তার গাধাটিকে যে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে তা সে জানতো না। অন্যান্য দরবেশরা যখন তাকে ব্যাপক আদর-আপ্যায়ন করতে শুরু করল, সে ভীষণ খুশি হয়ে গেল এবং দরবেশদের সাথে মিশে গেল। তার যখন যা লাগে সবকিছুর যোগান দিতে লাগল দরবেশরা।

নবাগত সুফি এরকম মেহমানদারি বা অতিথি আপ্যায়ন দেখে মনে মনে বলল: আজ রাতটা তো দেখছি আনন্দের পসরা সাজানো রাত। তাই আনন্দ-খুশিতেই রাতটা কাটানো উচিত। অতিথিপরায়ণতা দেখে মুসাফির দরবেশ সবকিছু ভুলে অর্থাৎ উদাসীনভাবে দরবেশদের সমাবেশে এসে যোগ দিল।

রাতের খাওয়া শেষে দরবেশরা সামার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে দিল। সামা এক ধরনের মরমি সঙ্গীত যা তালে তালে গাওয়া হয়। সামার আসরে ঢুকলেই শোনা যাবে যন্ত্রসংগীতের বিট। বিটের তালে তালে সবাই একসাথে এক ধরনের নাচের মতো দোলে। অবশ্য যে যার মতো নীরবে দোলে তাল ঠিক রেখে। সেইসাথে মরমি সঙ্গীত শিল্পী গান গায়। এই দোলের কারণে অনেকেই সামাকে নাচ বলে থাকেন। যদিও প্রচলিত নৃত্যকলার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

গায়ক যখন তার বাদ্য বাজনা শেষ করল তখন বেজে উঠলো আরেকটু সুর। সেই সুরের তালে সবাই মিলে গাইতে শুরু করল আরেকটি নতুন মরমি সঙ্গীত, যে সঙ্গীতের ভেতর একটি পঙক্তি দরবেশরা বারবার গাচ্ছিল। পঙক্তিটি হলো

"হুজুর এল খুশী এল, দুঃখ যত মুছে গেল

বলো বলো সবাই বলো, গাধা গেল গাধা গেল।"

সবাই যখন তবলার তালে তালে ‘গাধা গেল, গাধা গেল' বলে চিৎকার করে গজল গাইছিল তখন গাধার মালিক ফকির ভাবলেন, এটা বোধহয় এই এলাকার কোনো কাহিনী দিয়ে তৈরি করা গজল। তাই তিনিও অন্য সবার সাথে কোরাসে যোগ দিলেন।

অবশেষে রাত কেটে সকাল হলো। খানকার দরবেশরা একেকজন একেক দিকে যেতে লাগলো। নবাগত দরবেশও যাবার জন্য প্রস্তুত হলো। কিন্তু যখন সে খোঁয়াড়ে গেল তার গাধার সন্ধানে, গাধাকে দেখতে পেল না। মনে মনে ভাবলো হয়তো বা খানকার খাদেম গাধাকে চরাতে বাইরে নিয়ে গেছে। কিন্তু খাদেম এলো, তার সাথে গাধা নেই। নবাগত দরবেশ তাকে জিজ্ঞেস করল : এই বেটা! আমার গাধা কই?

খাদেম অবাক হয়ে বলল : গাধা! কোন্‌ গাধা?

দরবেশ : কোন্‌ গাধা আবার! আমার গাধা। কেন তোর কি মনে নেই, গতকাল আস্তানায় ঢোকার সময় এখানে তোর জিম্মায় আমার গাধাটা রেখেছিলাম।

খাদেম : তা মনে থাকবে না কেন? কিন্তু আপনার কি মনে নেই, গতরাতে যখন এত মজার মজার খানাপিনা খেলেন তা কোত্থেকে এল? যদি ভুলে গিয়ে থাকেন তাহলে শুনুন, আপনার গাধা বিক্রির টাকা দিয়েই ওসব কেনা হয়েছে।

দরবেশ : কি বললি! আমার গাধা বিক্রি করে ওসব কেনা হয়েছে! এই, এই বেটা, তোকে কে অনুমতি দিয়েছে আমার গাধা বিক্রি করার? বল্, বল্ শিগগির।

খাদেম : আপনি আমার উপর ক্ষেপছেন কেন? গাধা কি আমি বিক্রি করেছি নাকি? গাধা তো বিক্রি করেছে খানকার লোকজন।

দরবেশ : খানকার লোকেরা বিক্রি করেছে? কিন্তু তুই ওদেরকে গাধাটা দিতে গেলি ক্যান?

খাদেম : আমি কি করব? আমি কি জোরে ওদের সাথে পারি? ওরা ছিল ১০ জন। সবাই এসে আমাকে ভয় দেখিয়ে বলল, গাধাটা নিয়ে যাচ্ছি, যদি কোনো কথা বলিস তোর একদিন, কি আমাদের একদিন! একথা শোনার পর আমি জানের ভয়ে চুপ করে ছিলাম।

দরবেশ : তা না হয় মানলাম। কিন্তু ওরা খাবার-দাবার কিনে আনার পরও তো আমাকে জানাতে পারতিস। তাহলে নিশ্চয়ই ওদেরকে ধরতে পারতাম।

খাদেম : আমি তো এরকমই করতে চেয়েছিলাম। ঘটনার ঘণ্টা দুয়েক পর যখন আস্তানায় গেলাম তখন শুনতে পেলাম সবার সাথে আপনি জোরেসোরে বলে যাচ্ছেন, 'গাধা গেল, গাধা গেল' তখন আমি ভাবলাম, গাধা বিক্রির ঘটনাটা আপনি নিশ্চয়ই জেনেছেন। তাই কিছু না বলে ফিরে এসেছি।

খাদেমের কথা শুনে ফকিরের চেতনা ফিরে এল এবং আমতা আমতা করে বললেন:  তুই ঠিকই বলেছিস বাপু। আসলে সব দোষ আমারই। না জেনে, না বুঝে ওদের কার্যকলাপ অনুকরণ করে, ওদের তোষামোদে ফুলে গেছি আমি। যদি প্রথম থেকেই ভেবে দেখতাম, ‘গাধা গেল, গাধা গেল’ শ্লোগানের অর্থ কি- তাহলে নিশ্চয়ই এমনটি হতো না। এখন আর কিইবা করার আছে। আমার অন্ধ অনুকরণই আমার সাথে সাথে তোকেও ধোঁকা দিয়েছে। কবি ঠিকই বলেছেন :

"সর্বনাশ করে সবার অন্ধ অনুকরণ,

ধ্বংস হোক এ নীতির, হোক চির মরণ।"

বন্ধুরা, এবার তোমাদের জন্য রয়েছে কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর বিখ্যাত কবিতা কাজলা দিদি। আবৃত্তি করেছে বাংলাদেশের সমন্বিত সাংস্কৃতিক সংসদ- সসাসের সদস্য কাজী আফসারা ইমামা। 

কাজী আফসারা ইমামার চমৎকার উচ্চারণে কবিতাটি শুনলে। এ কবিতায় এক বোনহারা ভাইয়ের আকুতি ফুটে ওঠেছে। বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে রয়েছে কবি মতিউর রহমান মল্লিকের লেখা 'ছয়টি ঋতুর খেলা' শিরোনামের গানটি। সুর করেছেন মাহফুজ বিল্লাহ শাহী আর গেয়েছে সসাসের শিল্পীরা।

বন্ধুরা, তোমরা গানটি শুনতে থাকো আর আমরা বিদায় নিই রংধনুর আজকের আসর থেকে। কথা হবে আবারো আগামী আসরে।#

  

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

 

 

ট্যাগ