জুলাই ০৭, ২০২১ ২০:২৬ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো কালজয়ী একটি প্রবাদের গল্প। ইরানি কবি শেখ সাদি'র জীবনের একটি গল্প নিয়ে গড়ে উঠছে এই প্রবাদ: 'উট দেখেছো, দেখো নি'।

গল্পটি এরকম: সাদি এক শহর থেকে আরেক শহরে ভ্রমণে যেতেন। সাধারণত ঘোড়ায় বা অন্য কোনো বাহনে চড়েই যেতেন। কিন্তু একদিন একটু ব্যতিক্রম হলো। সাদি নিজেই ভাবলেন সবসময় তো বাহনেই যাই আজ একটু পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াবো। হাঁটতে শুরু করলেন কবি সাদি। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তাঁর নজরে পড়লো একটা প্রাণীর পায়ের ছাপ। তিনি মাটিতে বসে খুব ভালো করে পায়ের ছাপটি নিরীক্ষণ করে নিশ্চিত হলেন-উটের পায়ের ছাপ।

বসে থেকেই সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন চতুষ্পদী ছন্দময় ছাপ চলে গেছে অনেকদূর। মনে মনে ভাবলেন একটি উট তাহলে তাঁর আগে এ রাস্তা ধরে সামনের দিকে গেছে। যেতেই তো পারে। সাদি উঠে দাঁড়িয়ে উটের পায়ের ছাপ অনুসরণ করতে লাগলেন। কিছুদূর যাবার পর দেখলেন রাস্তার পাশে বেড়ে ওঠা তরতাজা ঘাস অর্ধেক খাওয়া। বাঁ পাশের ঘাসগুলোই খাওয়া হয়েছে, ডান পাশের ঘাসগুলোতে মুখই দেয় নি। সাদি ঘাসের দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে কীসব ভাবলেন।

ভাবাভাবির পর সাদি ঘাসের পাশে বসে উটের পায়ের ছাপ খুঁজলেন এবং দেখলেন পায়ের ছাপ সামান্য এলোমেলো হয়ে আবারো সামনের দিকে চলে গেছে ছন্দময় চালে। সাদি আবার ঘাসের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন: উটটি নিশ্চয়ই কানা। ডান চোখ কানা। কেননা বাঁ চোখ দিয়ে যতোটুকু ঘাস সে দেখতে পেয়েছে সেটুকু ভালোভাবে খেয়েছে। কিন্তু ডান চোখ দিয়ে যেহেতু দেখতে পায় নি, তাই ওপাশের ঘাসগুলো তরতাজা রয়ে গেছে। সেগুলোতে মুখই লাগায় নি কানা উট। সাদি আনমনে হাঁসলেন-উট আবার কানা। কবিদের এরকম বিচিত্র চিন্তা থাকে, দৃষ্টি থাকে, যা সাধারণ মানুষের থাকে না। এ কারণে সাধারণ মানুষ কবিদেরকে অনেক সময় পাগল বলে অভিহিত করে। যদিও প্রকৃত সত্য হলো কবিদের দৃষ্টি যতদূর যায়, যতো সম্প্রসারিত হয় অন্যদের তেমনটা হয় না। এই দূরদৃষ্টির কারণেই কবিরা আজ যা দেখেন বা ভাবেন অন্যরা তা দেখে বা ভাবে বহু যুগ কিংবা বহুকাল পর।

ঘাসের তরতাজা সবুজ পেছনে ফেলে কবি সাদি এগিয়ে যান সামনের দিকে। উটের রচিত পায়ের ছন্দ দেখতে দেখতে কবির নজরে পড়ে যায় আবার নতুন একটি রেখা। দেখতে ছায়ার মতো। এ আবার কীসের রেখা! কবিকে ভাবিয়ে তোলে। ভাবতে ভাবতে রেখা ধরে সামনে যেতে যেতে হঠাৎ তিনি দেখলেন এক গুচ্ছ মাছি ঐ রেখার ওপর বসে আছে। কবি একটু আনত হয়ে দেখতেই মাছিগুলো উড়ে গিয়ে একটু দূরে সেই রেখার ওপরই বসে পড়ে। কবি খুব ভালোভাবে চিন্তা করতে লাগলেন আর ছায়ার মতো রেখাটির সামনে পেছনে তাকাতে লাগলেন। মাছি বসতে দেখে কবি ভাবলেন এই রেখা সিক্ত মানে ভেজা। রেখাটি নিশ্চয়ই দুধের, সেজন্যেই মাছি বসেছে। কবি আবারো হাঁসলেন। আহা রে, অ্যাকে তো কানা উট, তার উপরে দুধের পাত্রটাও ফুটো।

কানা উট, ফুটো দুধের পাত্র। সবই কবির ভাবনা, সুচিন্তিত কল্পনা। বাস্তবতা যে কী সেটা কে জানে! কবি এগিয়ে যান ছন্দময় চতুষ্পদী চিহ্ন দেখে দেখে।  এবার একটু এগুতেই দেখেন পদচিহ্নের পাশে বড়ো একটা গর্তের মতো। মহিলার জুতোর ছাপও তার পাশে দেখা গেল। কবি মনে মনে বললেন তার মানে উট এখানে শুয়ে বিশ্রাম নিয়েছে। উটের পিঠে ছিল এক মহিলা সওয়ারি। সেও উটের পিঠ থেকে এখানে নেমেছে। সাদি আবারো সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন ছন্দময় চতুষ্পদী চিহ্ন চলে গেছে আগের মতোই। কবি ভাবলেন ওই মহিলা একটু বিশ্রাম নিয়ে আবারো রওনা হয়েছে, একটু দ্রুত এগিয়ে গেলে হয়তো দেখাও হয়ে যেতে পারে। তাহলে নিজের ভাবনাগুলোর সাথে বাস্তবতার মিল আছে কিনা মিলিয়ে নেওয়া যাবে। কবি তাই আবারো পা বাড়ালেন।

এবার আগের চেয়ে একটু দ্রুত গতিতে। একটু এগুতেই দেখলেন হন্যে হয়ে একটা লোক এদিক ওদিক তাকাচ্ছে আর দৌড়াচ্ছে। তার চেহারায় পেরেশানির সুস্পষ্ট ছাপ। সাদি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ কী হয়েছে? আপনাকে এরকম বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন?

লোকটি বললোঃ আমার উট পালিয়ে গেছে। তুমি এদিক দিয়ে যেতে দেখ নি?

সাদি জানতে চাইলেনঃ আচ্ছা তোমার উটের কি ডান চোখ কানা?

লোকটি জবাব দেয়ঃ হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার উটের ডান চোখ কানা।

সাদি জানতে চাইলেনঃ উটের পিঠে কি দুধ ভর্তি একটা পাত্র ছিল?

লোকটি জবাব দেয়ঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ! দুধের পাত্রটা ভর্তি ছিল।

সাদি বলেনঃ আমি অবশ্য তোমার উটটাকে দেখি নি...

লোকটি বললোঃ দেখো নি? যদি না-ই দেখে থাকো..তাহলে এইসব আলামত কীভাবে দেখলে! তুমি আমার উট চুরি করে লুকিয়ে রেখেছো..

সাদি বললেনঃ এটা কী ধরনের কথা বলছো? তোমার উট কি একটা ইঁদুরের মতো যে আমি এই জনমানবহীন মরুতে তাকে লুকিয়ে রাখবো? আমি কিছু কিছু আলামত দেখতে পেয়েছি, যা থেকে চিন্তা করেছি এ ধরনের একটা উট এ পথ দিয়ে গেছে..।

লোকটা কোনো কথা না বলে তার হাতের লাঠি দিয়ে সাদিকে মারতে শুরু করে দিলো। মার খেতে খেতে সাদি চেষ্টা করেছিলো লোকটাকে বোঝাতে যে তিনি নির্দোষ। মারের ফাঁকে লোকটার নজর পড়ে গেলো সামনের দিকে ... একটা উট ... খানিকটা দূরে ... দেখা যাচ্ছে ....

মার বন্ধ করে লোকটা দ্রুত দৌড়ে গেল উটের দিকে।

সাদি আপনমনে স্বগতোক্তি করলেনঃ হে কবি ! তৃতীয় নয়নের অধিকারী দূরদর্শী কবি! এতো বিচক্ষণ চিন্তা করো, কিন্তু কেন তৃতীয় নয়নে দেখা ছবি দেখাতে গেলে চক্ষুহীনকে ! কেন তুমি যে উট দেখো নি তার বর্ণনা দিতে গেলে ! ভাবা উচিত ছিল হে কবি ! সবকিছু জানলেও না বলাই ভালো, সব বলতে হয় না। তোমার উচিত ছিল আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করাঃ ‘উট দেখেছো, দেখো নি’।

এই ঘটনার পর থেকে ‘উট দেখেছো, দেখো নি’ এটি একটি প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়ে গেল। আর প্রবাদটি বলার সময় একজন আরেকজনকে বোঝানোর চেষ্টা করে, যা কিছু জানো, সব মুখে না আনাই ভালো। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ