জুলাই ০৯, ২০২১ ১৬:৫৪ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশাকরি যে যেখানে বসে আমাদের অনুষ্ঠানে শুনছো সবাই ভালো ও সুস্থ আছে। সপ্তাহ ঘুরে রংধনুর আসর সাজিয়ে তোমাদের মাঝে হাজির হয়েছি আমি গাজী আবদুর রশিদ এবং আমি আকতার জাহান।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই নবীবংশের মহান ইমাম হযরত জাফর আস-সাদিক (আ.)-এর নাম শুনেছো? তিনি ছিলেন ইমামতি ধারার বারোজন ইমামের মধ্যে ষষ্ঠ উত্তরাধিকারী। তাঁর ডাক নাম ছিল আবু আবদুল্লাহ। তবে তিনি ‘আস-সাদিক, ‘আল-ফাযিল’ও ‘আত-তাহির’উপাধিতে পরিচিত ছিলেন। জাফর সাদিক ছিলেন পঞ্চম ইমাম মুহাম্মাদ আল বাকির (আ.)-এর পুত্র। তাঁর মাতা উম্মে ফারওয়া ছিলেন কাশেম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকরের কন্যা।

ইমাম জাফর আস-সাদিক (আ.) জীবনের প্রথম বারো বছর অতিবাহিত করেন পিতামহ ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.)-এর তত্ত্বাবধানে এবং পরবর্তী ১৯ বছর কাটান পিতা ইমাম মুহাম্মাদ আল-বাকির (আ.)-এর পৃষ্ঠপোষকতায়। ১১৪ হিজরিতে পিতা ইমাম মুহাম্মাদ আল-বাকির শাহাদাত বরণ করলে হযরত জাফর আস-সাদিক (আ.) ষষ্ঠ ইমাম হিসেবে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। এভাবেই পূর্ববর্তী ইমামের উত্তরাধিকারী হিসেবে ইসলাম প্রচার ও আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনার পবিত্র দায়িত্ব তাঁর ওপর বর্তায়। এরপর তিনি ১৪৮ হিজরি পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ'র হেদায়াতের দায়িত্ব পালন করেন।

বন্ধুরা, তোমরা জেনে খুশি হবে যে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় ইমাম জাফর আস-সাদিকের বহুমুখী বিচরণ সমগ্র মুসলিম বিশ্বের প্রশংসা লাভ করে। জ্ঞানের সন্ধানে দূর-দূরান্ত থেকে বহু ছাত্র আসত তাঁর কাছে। খোদায়ী আইন বিধানের আলেম ও বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ ইমাম জাফর সাদিকের বহু হাদিসের উদ্ধৃতি গ্রহণ করেছেন। এমনকি তাঁর ভক্ত শিষ্যরা বিজ্ঞান ও চিত্রকলার বিভিন্ন দিকের ওপর শত শত বই সংকলন করেছেন।

ফিকাহ, হাদীস ও তাফসীর ছাড়াও তিনি ছাত্রদের অংক ও রসায়নশাস্ত্র শিক্ষা দান করেছেন। তাঁর জ্ঞান ও হেদায়াতের সুফলপ্রাপ্ত শিষ্যদের একজন হলেন খ্যাতনামা অংকশাস্ত্রবিদ জাবের ইবনে হাইয়ান আত-তূসী। ইমাম জাফর সাদিক তাঁর ইমামতের শেষ দিন পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিস্তারের কাজ করে গেছেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানী ও প্রতিভাবানদেরকে উচ্চতর জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন।

আল্লামা শিবলী নোমানী তাঁর ‘সিরাতুন্নোমান’ গ্রন্থে লিখেছেন, ইমাম আবু হানিফা ইমাম জাফর আস-সাদিকের কাছ থেকে ফিকাহ ও হাদীসের বিশেষ জ্ঞান অর্জন ও গবেষণার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সময় তাঁর সাহচর্যে অতিবাহিত করেন। সকল মাযহাবের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে, ইমাম আবু হানিফার জ্ঞানের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছেন ইমাম জাফর আস-সাদিক ও তাঁর সাহচর্য।

বন্ধুরা, ইমাম জাফর সাদিক (সা)-এর ইসলামী জ্ঞান সম্পর্কে আজকের আসরে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা শোনাব। এরপর থাকবে একটি কবিতা ও গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।

বহু দিন থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিল খুবই জনপ্রিয়। সকলের মুখে মুখে তার নাম আলোচিত। চারদিকে তার তাকওয়া, পরহেযগারী ও ঈমানদারীর চর্চা হতো। সর্বত্র লোকেরা তার উন্নত চরিত্র ও শ্রেষ্ঠত্বের মহিমা গেয়ে বেড়াতো। অনেক সময় হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)- এর সামনেও লোকেরা তার তাকওয়া-পরহেজগারী ও সৎ চরিত্রের কথা আলোচনা করেছে। তাই ইমাম (আ.)-এর চিন্তা হলো এমন একজন খোদাভক্ত লোককে সবার অলক্ষ্যে নিজের চোখে দেখা দরকার। যে সাধারণ মানুষের মধ্যে এতো বিরাট জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি অর্জন করে নিয়েছে। প্রত্যেক মানুষই তাকে অত্যন্তসম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখে।

একদিন হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) একজন অপরিচিত লোকের মতো সে ব্যক্তির কাছে গেলেন। দেখতে পেলেন তার আশপাশে তার ভক্তবৃন্দ ভিড় জমিয়ে বসে আছে। তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ-জাহেল। ইমাম জাফর সাদিক নিজের পরিচয় না দিয়ে চুপচাপ বসে বসে সব কিছু অবলোকন করতে লাগলেন। প্রথম দর্শনেই ইমামের বুঝতে দেরি হলো না যে, সে ধোঁকার নীতি অবলম্বন করে লোকদেরকে আকৃষ্ট করে রেখেছে। একবার সে লোকদের ভিড় থেকে বেরিয়ে পড়লো এবং এক সড়ক পথে এগিয়ে যেতে লাগল। ইমামও তার পিছে পিছে যাচ্ছিলেন যাতে করে দেখতে পারেন যে, সে কোথায় যায় এবং কী করে? এমন কোন্ কাজটি করে, যার কারণে লোকেরা তার প্রতি এত আসক্ত হয়ে গেছে?

কিছু দূর চলার পর সে একটি রুটির দোকানের সম্মুখে দাঁড়িয়ে গেল। একটি দৃশ্য দেখে ইমাম অবাক হয়ে গেলেন যে, লোকটি দোকানদারের অগোচরে দুটি রুটি নিয়ে নিজের কাপড়ের নিচে গোপন করে ফেলল! এরপর সে আরো সামনে এগুতে লাগল।

ইমাম ভাবলেন- হতে পারে এ রুটিগুলো সে খরিদ করার উদ্দেশ্যেই নিয়েছে। এর দাম হয়তো আগেই পরিশোধ করে দিয়েছে অথবা পরে পরিশোধ করবে। কিন্তু এমনটিই যদি হবে তাহলে দোকানদারের দৃষ্টির আড়ালে রুটিগুলো তুলে নেবে কেন? আর দোকানিকে কিছু না বলেই সামনে চলে যাবে কেন?

সে যাই হোক, ইমাম (আ.) তার পিছে পিছে অনুসরণ করে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলেন। তিনি রুটির দোকানের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছিলেন। ঠিক এমনি সময় সে লোকটি একটি ফলের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। দোকানদারের চোখ একটু আড়াল হতেই সে খপ করে দুটি ডালিম নিজের কাপড়ের নিচে লুকিয়ে ফেললো!

এরপর সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। এটা দেখে ইমাম আরো অবাক হয়ে গেলেন। কিন্তু ইমামের আশ্চর্য হওয়ার সীমানা তখন ছাড়িয়ে গেল যখন তিনি দেখলেন যে, লোকটি সে রুটিগুলো ও ডালিমগুলো একজন রুগীকে দান করে দিল। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পর ইমাম তার সামনে এসে তাকে বললেন, আজ আমি তোমাকে আশ্চর্য ধরনের কিছু কাজ করতে দেখলাম। এই অবৈধ কাজগুলোর ব্যাখ্যা কী?

লোকটি ইমামকে কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করে বলল, আমার মনে হয় আপনি জাফর ইবনে মুহাম্মাদ (আ.)।

জবাবে ইমাম বললেন, হ্যাঁ, তোমার ধারণা সত্য। আমি জাফর ইবনে মুহাম্মাদ।

লোকটি বলল, নিঃসন্দেহে আপনি রাসূলে পাক (সা.)-এর সন্তান এবং খান্দানী মর্যাদার দিক থেকে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। কিন্তু আমার আফসোস হয় যে, আপনি একজন অজ্ঞ জাহেল।

ইমাম (আ.) বললেন, তুমি আমার মধ্যে কি অজ্ঞতা-মূর্খতা দেখতে পেলে?

লোকটি বলল, আপনার এ প্রশ্নটিই মুর্খতা বৈ কিছু নয়। মনে হচ্ছে আপনি দ্বীনের সহজ-সরল হিসাবটাও জানেন না। আপনি কি জানেন না যে, মহান আল্লাহ বলেছেন: "যে ব্যক্তি একটি নেক কাজ করল, তাকে তার প্রতিদান দেয়া হবে দশ গুণ। আর যে ব্যক্তি একটি মন্দ কাজ করবে, তাকে তার পরিণতিতে সে পরিমাণ শাস্তি ব্যতীত আর কিছু দেয়া হবে না।" সুতরাং একটি গুণাহ'র কাজের জন্য একটি শাস্তি আর একটি নেক কাজের জন্য দশ গুণ সওয়াব। তাহলে সে হিসাবে আমি দুটি রুটি চুরি করেছি তাতে দুটি গুণাহ'র কাজ করেছি। আবার আমি দুটি ডালিম চুরি করেছি এ জন্য আরো দুটি গুণাহ আমার হিসাবে যোগ হয়েছে। অপরদিকে সে রুটি দুটি ও ডালিম দুটি আল্লাহর পথে একজন রুগীকে দান করে দিয়েছি যার প্রতিটির বিনিময়ে দশ নেকি করে আমার হিসাবে লেখা হয়েছে। এভাবে প্রতিটিতে দশ নেকী হিসাবে আমি চল্লিশটি নেকি লাভ করেছি। এখন খুব সহজে এ হিসাব করা যেতে পারে যে, আমার আমলনামায় চলিশটি সওয়াব লেখা হয়েছে। আর মোকাবিলায় গুনাহের সংখ্যা মাত্র চারটি। তাহলে এখন যদি আমার চলিশটি নেকি থেকে চারটি গুণাহ বিয়োগ করা হয় তাতেও আমার আমলনামায় ছত্রিশটি নেকি অবশিষ্ট থাকে। এ হলো সে সহজ-সরল হিসাব যা আপনি বুঝতে পারেননি এবং আমাকে অজ্ঞের মতো প্রশ্ন করে বসেছেন।

জাহেল লোকটির এমন ব্যাখ্যা শুনে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বললেন: তোমার মৃত্যু হোক। আসলে তুমি হলে বড় জাহেল যে নিজের ইচ্ছা মতো মনগড়া হিসাব-নিকাশ করছো। তুমি কি কোরআনের এ আয়াত পড়োনি যেখানে বলা হয়েছেন:  "মহান আল্লাহ কেবল মোত্তাকি পরহেজগার লোকদের আমলই গ্রহণ করে থাকেন।" এ সহজ-সরল আয়াতটি তোমার ভুল-ভ্রান্তি ধরিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। তুমি তো নিজেই তোমার চারটি গুণাহ'র কথা স্বীকার করে নিয়েছো। অন্যের মাল সদকা-খয়রাতের নাম দিয়ে অপরকে দিয়ে দিয়েছো। এতে কোন সওয়াব হবে না। শুধু তাই নয়, বরং এ কাজের দ্বারা তুমি আরো চারটি গুণাহ'র পাত্র হয়েছো। অনুরূপভাবে তোমার পূর্বের চার গুণাহের সাথে আরও চার গুণাহ যোগ কর। এ হিসাবে তোমার আমল নামায় আটটি গুণাহ লেখা হয়েছে। এদিকে সওয়াবের নামে তুমি কিছুই হাসিল করোনি।

ইমামের এ কথাগুলো লোকটির চেহারায় বিস্ময়ের ছাপ এঁকে দিল। সে কিছক্ষণ ইমামের দিকে তাকিয়ে থাকল। এ সময় ইমাম সেখান থেকে নিজের বাড়ি চলে গেলেন।

ইমাম (আ.) তার সাথীদের সামনে এ ঘটনা বর্ণনা করে বললেন, দ্বীনের ব্যাপারে এ ধরনের ব্যাখ্যা-বিশেষণ লোকদেরকে গোমরাহ বানিয়ে দেয় এবং অপর লোকদেরকেও সে পথভ্রষ্ট করে।

বন্ধুরা, তোমরা সবাই ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা জানবে এবং তাকওয়াবান হওয়ার চেষ্টা করবে- মহান আল্লাহর কাছে আমাদের প্রত্যাশা এটাই। তো এবারে রয়েছে 'তাকওয়া' শিরোনামের একটি গান। গানের কথা ও সুর আবদুস সালামের। আর গেয়েছে সন্দীপন শিল্পীগোষ্ঠীর ছোট্টবন্ধুরা।

চমৎকার কথামালায় সাজানো গানটি শুনলে। বন্ধুরা, এবার তোমাদের জন্য রয়েছে উপদেশমূলক একটি কবিতা। কালী প্রসন্ন ঘোষের লেখা বিখ্যাত 'পারিব না' কবিতাটি আবৃত্তি করেছেন ঢাকার সারেগামা একাডেমির সদস্য হৃদিতা।

হৃদিতার চমৎকার উচ্চারণে কবিতাটি শুনলে। তো বন্ধুরা, তোমরা যারা রংধনু আসরে অংশ নিয়ে গান, ছড়া-কবিতা, গল্প কিংবা কেরাত শোনাতে চাও তারা আমাদের কাছে ইমেইল করে তোমাদের ফোন নাম্বার জানিয়ে দাও। ফোন নাম্বার পেলে আমরাই তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব।

তো বন্ধুরা, তোমরা ভালো ও সুস্থ থেকো আবারো এ কামনা করে গুটিয়ে নিচ্ছি রংধনুর আজকের আসর। কথা হবে আবারো আগামী সপ্তাহে।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

 

ট্যাগ