আগস্ট ২৫, ২০২১ ২১:৩৫ Asia/Dhaka

করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পেছনে কোনো রহস্য আসলে নেই,পরিস্থিতিটাই আসলে সংকটময়। একদিকে করোনার সংক্রমণ অন্যদিকে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সমস্যা,শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা,স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে অনভ্যাস সবমিলিয়ে সরকার কিংবা কর্তৃপক্ষ অনেকটা বাধ্য হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে।

রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড.সালমা নাসরিন। তিনি আরও বলেন,বর্তমান পরিস্থিতিতে নানাবিধ কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া উচিত। কারণ আমাদের পিট দেয়ালে ঠেকে গেছে।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ, উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান:অধ্যাপক ড. সালমা নাসরিন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মোকাবেলার জন্য বিভিন্ন সময়ে লকডাউন দেয়া হচ্ছে আবার তুলে নেয়া হচ্ছে। লকডাউন প্রত্যাহার করা হলে সব কিছুই স্বাভাবিক হচ্ছে কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হচ্ছে না। একে অনেকেই রহস্যজনক বলে মনে করছেন। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

কোভিডি ১৯

অধ্যাপক ড.সালমা নাসরিন: ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি যে প্রশ্নটি করেছেন সে বিষয়ে প্রথমে বলব আসলে এর পেছনে রহস্য আছে কি নেই তা এই মুহূর্তে বলাটা আসলে জটিল। রহস্য ঠিক না আসলে আমরা যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি সেটি খুবই সংকটময়। আপনি জানেন যে, বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত জনবহুল দেশ। এটি একটি বড় সমস্যা। আমাদের এখানে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর অবকাঠামোগত দিকগুলো কিন্তু সেভাবে সমভাবাপন্ন নয়। অর্থাৎ স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষের যে আসন ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতূল। ধরুন চল্লিশজন শিক্ষার্থীর জন্য  বরাদ্দ আসনে আমরা প্রায় দ্বিগুণ শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস করে থাকি। বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্র এমন। ফলে কোভিড পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধির প্রধান যে বৈশিষ্ট্য সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা সেটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এটি মেনে চলা বাংলাদেশের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ।

তাছাড়া হাত ধোয়ার যে বিষয়টি সে সম্পর্কে বলব, গ্রামের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা কিন্তু এতে অভ্যস্ত না। এরবাইরে-মাস্ক পরার বিষয়টি রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা হলেও এই তিনটি বিষয়ের নিশ্চয়তা দেয়া কিন্তু কর্তৃপক্ষের জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি বিষয়। এসব ব্যাপারে খেয়াল রেখেই কিন্তু নীতি নির্ধারক, কর্তৃপক্ষ এবং সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে বলেই আমার কাছে মনে হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি সামনের দিকে কি হয় সে বিষয়টি কিন্তু অবজারভেশনে ছিল। যদি সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমে যায় তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া যায়। কিন্তু সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কখনও কখনও কমলেও সেটি আশানুরূপ কমেনি যে অবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা যায়। তো আমি বলব সে কারণেই সরকার কিংবা নীতি-নির্ধারকরা সম্ভবত মনে করছেন বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলাটা আসলে খুব বেশি যৌক্তিক হবে না।

রেডিও তেহরান: জ্বি অধ্যাপক সালমা নাসরিন, আপনি চমৎকার বললেন বিষয়টি। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে যে শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, এ ধরণের সংকটের মুখে। অন্য কোথায়ও কিন্তু সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি গুরুত্বসহ নিচ্ছেন না কেউ। যানবহান, হাটবাজার, মার্কেট, শিল্প কলকারখানা সর্বত্র উপচেপড়া মানুষের ভীড়। সবজায়গায় খুলে দেয়া হচ্ছে অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে।

পিজ

ড্রাগে আসক্ত হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা

করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে টানা ১৭ মাস। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বহু রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে যাতে বলা হচ্ছে- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে অনেক তরুণ-তরুণী অনাকাঙ্ক্ষিত পথে পা বাড়াচ্ছে। অনেকেই বেছে নিচ্ছে নেশাজাতীয় দ্রব্য, কেউ বেছে নিচ্ছে নানান ধরনের গেমস। এ সবই পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করছে। এ অবস্থায় আপনি কী মনে করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া উচিত?

অধ্যাপক ড.সালমা নাসরিন: দেখুন, আপনি যে প্রশ্নটি করলেন সে প্রসঙ্গে বলব-স্বভাবতই যখন কোনো মানুষ অ্যাক্টিভ থাকে না, কাজের মধ্যে থাকে না তখন  কিন্তু ঐসব বিষয়ের সাথে অনেকটা সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন, গেমসসহ অন্যান্য বিষয়গুলোর প্রতি ঝুঁকে পড়ে। আর এসব বিষয় শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই নয় আপামর জনসাধারণের মধ্যেও কিন্তু এসব আসতে পারে। তারা হতাশাসহ পারিবারিক ও সামাজিক অন্যান্য সংকটের মধ্যে পড়তে পারে। আর এসব বিষয় কিন্তু এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক হিসেবে আমার বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক যেসব বিশ্ববিদ্যালয় আছে তার চিত্রটা মোটামুটি আমার জানা আছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বড় অংশের ছেলে-মেয়েরা অত্যন্ত অস্বচ্ছল পরিবার থেকে এসে পড়াশুনা করছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তাদের হল জীবনসহ সংগ্রামমুখর যে জীবন সেই সাথে আর্থিক যে সংকটাপন্ন জীবন রয়েছে তা  আমরা জানি। তাদেরকে লেখাপড়ার খরচ চালাতে টিউশনির উপর নির্ভর করতে হয়। করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে তারা বাড়িতে চলে গেছে এবং বেকার অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ একদিকে আর্থিক সংকট সেইসাথে মানসিক এবং সামাজিক সংকট। সবকিছু মিলিয়ে তারা কিন্তু অনেক বেশি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। আর সেই পরিস্থিতিতে কেউ কেউ মাদকদ্রব্য গ্রহণ করছে। আমরা দেখেছি আপনিও জানেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র এলইডি নামক একরকমের মাদকসেবন করে আত্মহত্যা করেছে। তারমানে হচ্ছে বিষয়টি ঘটছে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে আমার মনে হয় এখন যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার মতো একটা অবস্থায় গিয়ে আমরা পৌঁছেছি। সামনে যদি সংক্রমণ ও মৃত্যুহার মোটামুটি কমে যায় তাহলে অবশ্যই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়াটাই অনেক বেশি যৌক্তিক হবে। তবে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে তা করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া উচিত

এরপর কথা থাকে যে আসলে ছাত্র-ছাত্রীরা কি চাচ্ছে? আমি নিজেও অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছি। আমাদের এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ব্যাপারে গবেষণা হয়েছে। তাছাড়া আমি নিজে যখন শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাই যে তোমরা আসলে কি চাচ্ছ? তাদের অধিকাংশের কাছ থেকে যে মতামতটি আমি পেয়েছি সেটি হচ্ছে- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হোক। তো শিক্ষার্থীরা চাচ্ছে, অভিভাবকরা চাচ্ছেন, সরকার এবং নীতি-নির্ধারকরাও কিন্তু এটি চাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের পিঠ একেবারে দেয়ালে ঠেকে গেছে। শিক্ষার্থীরা মাদকে আসক্ত হচ্ছে, হতাশার মধ্যে পড়েছে, সামাজিক ও পারিবারিক সংকট দেখা দিয়েছে ফলে অবশ্যই এসব কারণ বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

রেডিও তেহরান: বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে জাতিসংঘ শিক্ষার্থীদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের আহ্বান সম্পর্কে আপনি কি বলবেন?

অধ্যাপক ড.সালমা নাসরিন: জাতিসংঘের আহ্বান যৌক্তিক। তাদের সাথে আমি সহমতপোষণ করছি। তবে আমাদের এখানে সমস্ত জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় না আনা পর্যন্ত আমরা কিন্তু একটা ঝুঁকির মধ্যে থাকব। খুব স্বাভাবিকভাবে অভিভাকদের মাঝে এবং আমাদের মাঝে একটা উৎকণ্ঠা আছে। আমরা আসলে নিশ্চিত হতে পারছি না। বর্তমানে যেহেতু শিক্ষার্থীদের ক্যাটিগরিতে তাদেরকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। আমরা আশা করছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পুরোপুরি টিকার আওতায় নিয়ে আসা হবে। আশা করা যায় সে সময় প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়া সম্ভব।

রেডিও তেহরান: ড.সালমা নাসরিন সবশেষে একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে আপনার কাছে জানতে চাইব, যতদিন পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা না হচ্ছে যদিও আপনি বললেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার বিষয়টি এইমুহূর্তে বিবেচনা করা উচিত। তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

অধ্যাপক ড.সালমা নাসরিন: দেখুন, ছাত্রছাত্রীদের প্রতি যে বিষয়টি বলা সেটি হচ্ছে- করোনার দুযোর্গকাল একেবারেই প্রাকৃতিক একটি বিপর্যয়। এটি আজ আমাদের জীবনের উপর প্রভাব ফেলছে। সারা পৃথিবীর সাথে বাংলাদেশও চেষ্টা করছে এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার। সুতরাং শিক্ষার্থীদের অবশ্যই ধৈর্য্যধারণ করতে হবে। তাঁদেরকে ব্যস্ত থাকতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো কিভাবে তাঁরা ব্যস্ত থাকবে। আমাদের যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অন্যান্য যে মাধ্যমগুলো আছে সেগুলোতে বেশি সময় না কাটিয়ে সময়টাকে কিন্তু আমরা খুব ইতিবাচকভাবে কাটাতে পারি সঠিকভাবে। তাঁরা অনলাইনের মাধ্যমে নানাভাবে বই সংগ্রহ করে অ্যাকাডেমিক বই যেমন পড়াশুনা করতে পারে পাশাপাশি অন্যান্য বইও পড়তে পারে। আর এর মাধ্যমে কিন্তু তারা তাদের জ্ঞানকে নানাভাবে বাড়াতে পারে।

বই পড়ার মধ্য দিয়ে সময় কাটাতে হবে

সুতরাং আমার পরামর্শ হচ্ছে, ছাত্রছাত্রীরা যদি অলস সময় না কাটিয়ে কষ্ট করে হলেও সময়টাকে যদি তাঁরা ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে তাহলে আমার মনে হয় যে পরবর্তীতে এটি তাদেরকে আনন্দ দেবে। সুতরাং যে যে অবস্থানে আছে তাঁকে সেখানে থেকেই অ্যাক্টিভ থাকতে হবে। কিভাবে সে তার সময়টাকে সুন্দরভাবে কাটাবে সেই পরিকল্পনা করে এগোলে আমার মনে হয় বিরূপ প্রতিবেশের বিরুদ্ধে একধরণের জয় ঘোষণা করতে পারবে।

রেডিও তেহরান: তো অধ্যাপক ড. সালমা নাসরিন করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা নিয়ে রেডিও তেহরানের সাথে কথা বলার জন্য আপনাকে আবারও অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

অধ্যাপক ড. সালমা নাসরিন: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৪

 

ট্যাগ