আগস্ট ২৬, ২০২১ ১৬:১৯ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো কালজয়ী একটি ফার্সি গল্প। এ গল্পটির সারবস্তু হলো: স্বজাতির বাইরে ভিন্ন কোনো জাতির বাহ্যিক রূপ যতই সুন্দর এবং উদার মনে হোক না কেন তাকে হুট করেই বিশ্বাস করা ঠিক নয়।

তার উদারতা কিংবা খোশালাপ সবই এক ধরনের কৌশল কিংবা প্রতারণা বৈ কি!

কালিলা ও দেমোনা'র এই গল্পটির সঙ্গে আমাদের অনেকের হয়তো পরিচয় রয়েছে কিংবা পরিচয় না থাকলেও এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা আমাদের অনেকেরই রয়েছে। কিন্তু বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ হয়তো আমরা খুব কমই করে থাকি। গল্পটি আমাদের চিন্তাকে শাণিত করবে বলে আশা করি। তো চলুন তাহলে শুরু করা যাক আজকের গল্প।

পাহাড়ের পাদদেশে বাস করত কিছু বুনো পাখি। একটি কাক এবং একটি শাহী তিতিরেরও বাসা ছিল সেখানে। তাদের মাঝে দারুণ বন্ধুত্ব ছিল। একসাথে ভালোই কাটছিলো তাদের। একদিন তিতির একাকী গেল মরুভূমিতে। আর ফিরে এলো না। কয়েকদিন কেটে গেল। ফিরলোই না তিতির। তিতিরের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে চিন্তা হচ্ছিল কাকের। এভাবে সপ্তাহ পেরিয়ে যাবার পর একটা ধূসর তিতির কোনো এক স্থান থেকে এলো কাকের বাসার কাছে। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলো তার সমগোত্রীয় শাহী তিতির বাসায় নেই। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সে বাসাটাকে নিজের জন্য গোছগাছ করে নিলো এবং বসবাস করতে শুরু করলো। এদিকে নি:সঙ্গ কাক ধূসর তিতিরের আগমনে মনে মনে খুশি হলো। তাই নতুন প্রতিবেশী তিতিরকে স্বাগত জানালো।

তিতিরকে সানন্দে বললো: শাহী তিতির চলে যাবার পর আমি একা হয়ে পড়েছিলাম। তোমাকে দেখে খুশি হয়েছি। আশা করি এই বাসায় তোমার ভালোই কাটবে। ধূসর তিতির অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে কাকের সৌজন্যের জবাব দিলো এবং পরদিন কাকের বাসায় গেল। এভাবে তাদের মাঝে সখ্যতা গড়ে উঠলো এবং পরস্পরে তারা ভালো বন্ধু হয়ে গেল। কিছুদিন পর শাহী তিতির হঠাৎ ফিরে এলো। দেখলো যে তার বাসায় ধূসর তিতির বসে আছে। স্বাভাবিকভাবেই রেগে গেল শাহী তিতির।

শাহী তিতির চীৎকার করে ধূসর তিতিরকে বললো: আমার বাসায় বাস করার অনুমতি কে দিয়েছে তোমাকে?

ধূসর তিতির বললো: আমি আমার নিজের বাসায় বাস করছি। তুমি কে আবার? কে তোমাকে অনুমতি দিয়েছে এভাবে চীৎকার চেঁচামেচি করে আমাকে বিরক্ত করার? এভাবে চীৎকার করো না। শাহী তিতির ভীষণ ক্ষেপে গেল। বললো: এটা আমার বাসা! তুমি এখুনি আমার বাসা থেকে ভাগো! ধূসর তিতির বললো: তোমার হয়তো ছিল, কিন্তু আমি এখন এই বাসাটিকে নতুন করে মেরামত করেছি, সাজিয়ে গুছিয়ে তৈরি করে বাস করছি। এটি এখন আমারই বাসা। বাদানুবাদ বেড়ে গেল দুই তিতিরের মাঝে। তাদের চীৎকার চেঁচামেচি শুনে আশেপাশে জড়ো হলো অন্যান্য পাখিরা। তাদের মাঝে কাকও ছিল।

কিন্তু তারা কেউ বুঝে উঠতে পারছিলো না কার দাবি সঠিক। কাক চেষ্টা করলো তাদের মাঝে মিটমাট করে দেওয়ার কিন্তু কাজ হলো না। অন্যান্য পাখিরাও চেষ্টা করলো দু'জনের মাঝে সমঝোতা করার কিন্তু দুই তিতিরের কেউই একমত হলো না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো দুই পক্ষের ঝগড়া মেটানোর জন্য একজন নিরপেক্ষ বিচারক নিয়োগ করা হবে যাতে সত্য সুস্পষ্ট হয়। তিতিরেরা কাককে কোনোভাবেই বিচারক হিসেবে মানলো না। অবশেষে একটি পাখি প্রস্তাব দিলো: বেড়ালের যেহেতু বাসার প্রয়োজন নেই সুতরাং বেড়ালকে বিচারক করা হোক। সে আরও বললো: বেড়াল এমন এক প্রাণী যে কিনা মানুষের সঙ্গে বাস করে। সুতরাং সে জানে কী করে ন্যায় বিচার করতে হয়। এই প্রস্তাবে রাজি হলো উভয় তিতির এবং বেড়ালের কাছে গেল তারা।

কাক কৌতূহলবশত দুই তিতিরের পেছনে পেছনে গেল কী হচ্ছে দেখার জন্য। বেড়াল তার ঘরেই বসে ছিল। সে খাবারের সন্ধানে ছিল কিন্তু খাবার সংগ্রহ করা যায় কীভাবে ভেবে পাচ্ছিলো না। তিতিরগুলোর পায়ের শব্দ শুনে চোখ বন্ধ করে নি:শ্বাস নিয়ে বিড়াল বললো: বাহ বাহ! পাখির ঘ্রাণ পাচ্ছি। তিতিরেরা বেড়ালকে বাসায় দেখতে পেয়ে খুশি হলো এবং বেড়ালের ঘুম ভাঙার অপেক্ষায় থাকলো। বেড়াল চোখ মেলতেই পাখিরা সালাম করলো এবং পুরো ঘটনা বর্ণনা করে বললো: আপনি সুষ্ঠু বিচার করে দিন। বেড়াল রাজি হলো এবং দুই তিতিরকে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে পুরো বিষয়টা জানার চেষ্টা করলো। পাখিরা যখন ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলো বেড়াল তখন চীৎকার করে বলে উঠলো: যেমনটি ভেবেছিলাম পার্থিব স্বার্থ আর সম্পদ নিয়েই তোমাদের মাঝে ঝগড়া হয়েছে।

এরপর বললো: আমি বুড়ো হয়ে গেছি! কানে ভালো শুনতে পারি না। দু:খজনকভাবে তোমাদের কথাগুলো ভালো করে শুনতে পারি নি, বুঝতেও পারি নি আমি। তোমরা একটু কাছে এসো এবং আরেকটু উচ্চস্বরে কথাগুলো আরেকবার শোনাও যাতে ন্যায় বিচার করতে সুবিধা হয়। বিড়ালের কথা শুনে পাখিরা আরও কাছে এলো। তিতির পাখিরা তাদের নিজ নিজ আর্জি পেশ করলো এবং সুষ্ঠু ও ন্যায় বিচার কামনা করলো। বেড়াল জানতে চাইলো: তোমরা আমাকে বলো তো তোমাদের দুজনের মধ্যে কে আসলে ওই বাসাটির মালিক? তবে যাই বলো একটু জোরে বলো যেন ভালোভাবে শুনতে পাই। দুই তিতিরই বেড়ালের এরকম কথা শুনে খুশিমনে ভাবলো: যাক! আশা করা যায় সঠিক বিচার পাওয়া যাবে। সুতরাং দুই পাখিই বেড়ালের আরও কাছে গেল।

তিতিরেরা যখন বেড়ালের কথার জবাব দিচ্ছিলো তখন হঠাৎ করেই বেড়াল দুই পাখির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং বেড়ালের থাবার শিকার হয়ে মারা পড়লো তিতিরেরা। পাখি দুটোকে খাওয়ার পর বেড়াল জিহ্বা দিয়ে মুখ চাটতে চাটতে আপনমনে বললো: দুর্বল ও নিরীহ প্রাণীরা নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান না করে,কী করে? যায় শক্তিশালী এমন কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে যার বাহ্যিক রূপ দেখে তারা প্রতারিত হয়, ভাবে খুব ভালো ও আদর্শবান! কী অবাক কাণ্ড! অথচ সে ক্ষেত্রে শক্তিশালী তৃতীয় পক্ষ ভাবে ন্যায় বিচার হলো আগে নিজের ক্ষুধার চাহিদা নিবারণ করা!#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ