সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২১ ১৭:৩৪ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো কালজয়ী একটি ফার্সি প্রবাদের নেপথ্য গল্প। প্রবাদটি হলো ‘অসুস্থই বোঝে সুস্থতার মর্ম'। প্রাচীনকালের ঘটনা। এক ব্যবসায়ী ছিল বেশ অভিজ্ঞ।

সে সিদ্ধান্ত নিল পণ্যের বিশাল একটা চালান নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ওপারে যাবে। সেখানে জিনিসপত্রের দাম ভালো পাওয়া যাবে এবং তাতে লাভ হবে প্রচুর। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবসায়ী তার মালামাল সমুদ্র তীরের একটি বন্দরে নিয়ে হাজির করলো। তারপর সব মাল-সামানা তুলে দিলো জাহাজে।

ব্যবসায়ীর এক শাগরেদ ছিল বেশ বিশ্বস্ত। তার ওপর ব্যবসায়ী মোটামুটি তার সব কাজের ব্যাপারেই নির্ভর করতো। শাগরেদও তার পাশেপাশেই থাকতো সবসময়। ব্যবসায়ীর কাজকর্ম দেখাশোনা করতো। তো ব্যবসায়ীর মালগুলো জাহাজের স্টোরে বোঝাই করার পর ওস্তাদ-শাগরেদ দু’জনই খুশিমনে জাহাজে চড়লো। শাগরেদ ভীষণ খুশি। কারণ ব্যবসায়ী ভদ্রলোক মাল-সামানা নিয়ে বহুবার জাহাজে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে। কিন্তু শাগরেদ এই প্রথমবারের মতো কিশতিতে উঠলো। এটাই তার প্রথম সমুদ্রযাত্রা। মনে মুনে ভীষণ খুশি সে। ভেতরে একেবারে ফুরফুরে ভাব। এই প্রবাদ গল্পটি আমাদের চিন্তাকে নাড়া দেবে বলে আশা করি।

জাহাজ তখনও ছাড়ে নি। ব্যাপক কৌতূহলি মনে শাগরেদ একবার জাহাজের উপরে যায় এটা ওটা দেখে ইত্যাদি। আবার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিদায় দিতে আসা লোকজনের উদ্দেশে হাত নাড়ায়, খোদাহাফেজি করে। একজন মহান ব্যবসায়ীর সাথে সফরে যাচ্ছে, সুতরাং মনে মনে গর্বিত সে। অনেক স্বপ্ন, অনেক প্রত্যাশাও মনে মনে লালন করতে শুরু করেছে শাগরেদ। ভাবনা আর কল্পনার ঢেউয়ের ওপর জাহাজ যাত্রা শুরু করলো। বন্দর উপকূল থেকে কিছুটা দূরে যেতেই শাগরেদ এদিক-ওদিক তাকিয়ে কিছুটা ভয় পেয়ে গেল। আস্তে আস্তে হারিয়ে গেল উপকূল। যেদিকেই তাকানো যায় পানি আর পানি। পানি ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়ছে না আর। সেই পানিও তো শান্ত নয়।

মাঝেমাঝেই বিশাল ঢেউ হয়ে ছলাৎ করে জাহাজের গায়ে আছড়ে পড়ে আবার কখনো ঢেউ পুরো জাহাজকেই উপরে তুলে দিয়ে হঠাৎ ছেড়ে দেয়। উত্থান পতনের এই ভয়ংকর দোলে নিজেদের ভারসাম্য বজায় রাখতে জাহাজের ভেতরের শক্ত কোনো জিনিস জোর করে ধরে বসে থাকতে চেষ্টা করছিল সবাই। শাগরেদের তো বুকের ভেতর ধক ধক করতে শুরু করেছে। ভীষণ ভয়ে আতঙ্কিত সে। মনে মনে বললো: কী ভুলটাই না করেছি। আমার কি খানাপিনার সমস্যা ছিল? কেন আমি জাহাজে পাড়ি জমাতে গেলাম? ব্যবসায়ী কিন্তু তার শাগরেদের ওপর নজর রাখছিল। সে দেখছিল সবকিছু। বুঝতে পারলো শাগরেদ ভয় পেয়ে গেছে।

শাগরেদের মাথায় হাত দিয়ে বলছিলো: সমুদ্রযাত্রা কিন্তু ভীষণ মজার। যে সমুদ্রে পাড়ি জমায় নি কখনো সে প্রথম প্রথম একটু ভয় পায় এমনকি অনেক সময় জবুথবুও হয়ে পড়ে। কেউ কেউ তো অসুস্থও হয়ে পড়ে। কিন্তু সফর করতে করতে সেই সমস্যা কেটে যায় এবং সমুদ্রের বিচিত্র সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সফরটাকে উপভোগ করে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। শাগরেদ ভয়ে আতঙ্কে জাহাজের একটা পিলার আঁকড়ে ধরেছে একেবারে আঠার মতো। তার চেহারার রঙ পাল্টে গেছে, ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার দুই চোখ ছিল সমুদ্রের দিকে, কানে ব্যবসায়ীর কোনো কথাই ঢুকলো না তার। ব্যবসায়ী শাগরেদের অবস্থা দেখে ভাবলো এখন কিছু বলে কাজ হবে না। সে তার মতোই থাক আপাতত। আরও ভাবলো শাগরেদের ভয় পাওয়াকে গায়ে না মাখালে শাগরেদ হয়তো নিজে নিজেই তার সমস্যা কেটে উঠবে।

কিন্তু সেরকম হলো না। এক ঘণ্টাও হয় নি জাহাজ ছেড়েছে। এরইমধ্যে শাগরেদের চীৎকার চেঁচামেচি জাহাজের সকল যাত্রীর দৃষ্টিতে পড়েছে। শাগরেদ চীৎকার করে চেঁচাতে শুরু করলো: বাঁচাও! আমাকে রক্ষা করো! আমি ভুল করেছি...জাহাজে চড়েছি। আমাকে বন্দরে ফিরিয়ে নাও! ব্যবসায়ী শাগরেদের সামনে গিয়ে বললো: চীৎকার চেঁচামেচি বন্ধ করো। পাগল হলে নাকি! একটু ধৈর্য ধরো। সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে জাহাজের উত্থান পতনে নিজেকে অভ্যস্ত করে নাও! কিন্তু ব্যবসায়ীর কথা এবারও কানে ঢুকলো না শাগরেদের। সে আগের মতোই চীৎকার চেঁচামেচি করতে লাগলো। বারবার বলতে লাগলো: আমাকে বন্দরে নামিয়ে দাও! আমি নেমে যাবো। জাহাজের অন্যান্য যাত্রী শাগরেদের চারপাশে জড়ো হলো এবং ঠাট্টা মশকরা করতে লাগলো। এরপর ব্যবসায়ী করলো মজার এক কাণ্ড।

ব্যবসায়ী যখন দেখলো তার শাগরেদ মান-ইজ্জত সব ডুবাবে তখন একটা বুদ্ধি আঁটলো। জাহাজ থেকে কেউ পানিতে পড়ে গেলে তাকে উদ্ধার করার জন্য যেসব উদ্ধারকর্মী থাকে তাদের একজনকে বললো:  প্রস্তুত থাকো! আমার শাগরেদকে উদ্ধার করতে হবে। এই বলে ব্যবসায়ী রেগেমেগে শাগরেদের কাছে গিয়ে বললো: তোর মতো ভীতু শাগরেদের আমার কোনো দরকার নেই। তোকে এখন পানিতে ফেলে দেবো, নিজে নিজে সাঁতার কেটে বন্দরে গিয়ে উঠবি। এই বলে এক ধাক্কায় শাগরেদকে ফেলেই দিলো পানিতে। বেচারা শাগরেদ তো কল্পনাই করে নি এ ধরনের বিপর্যয়কর অবস্থার মুখোমুখি হবে, সত্যি সত্যি পানিতে ফেলে দেওয়া হবে তাকে। এখন মনে মনে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিলো। মৃত্যু ছাড়া তার সামনে তো আর বাঁচার কোনো পথ দেখছে না সে। কান্নাকাটি করতে লাগলো আর বাঁচাও বাঁচাও বলে চীৎকার করতে লাগলো। একটু পরেই উদ্ধারকর্মী পানিতে ঝাঁপ দিলো এবং শাগরেদকে ধরে তুলে নিয়ে জাহাজের ডেক বা পাটাতনে রাখলো।

অথৈ সমুদ্রের পানিতে নিশ্চিত মৃত্যুর আশঙ্কা থেকে জাহাজের এই পাটাতন অনেক বেশি নিরাপদ মনে হলো শাগরেদের কাছে। তাই পাটাতনের এক কোণে গিয়ে চুপ করে বসে থাকলো। জাহাজের অপরাপর যাত্রীরা ব্যবসায়ীর বুদ্ধি দেখে ভীষণ খুশি হলো। ব্যবসায়ীর চারপাশে সবাই সমবেত হলো। জিজ্ঞেস করলো: এটা কী ধরনের চিকিৎসা যা আমাদের মাথায় কাজই করে নি! ব্যবসায়ী বললো: আমার শাগরেদকে যখন পানিতে ফেলে দিয়েছি তখন নিশ্চিত ছিলাম যে ও বুঝতে পারবে সমুদ্রের পানিতে ডুবে মরার চেয়ে জাহাজের যাত্রী হওয়া অনেক বেশি নিরাপদ এবং ভালো। পানিতে না পড়লে সে জাহাজের মূল্যটা উপলব্ধি করতে পারতো না। এরপর থেকে যখনই কেউ বিপদে না পড়ার কারণে নিয়ামতের মূল্য বুঝতে না পারতো তার সম্পর্কে বলা হতো: অসুস্থই বোঝে সুস্থতার মর্ম'।#   

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ০৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ