সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২১ ১৮:৪৫ Asia/Dhaka

আজ আমরা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাকের পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ সম্পর্কে সংক্ষেপ আলোচনা করব।

কারবালা-৫ অভিযানের পর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দুই পরাশক্তি শক্তভাবে ইরাকের সাদ্দাম সরকারের পাশে দাঁড়ায়।  ইরাক সরকার দক্ষিণ ফ্রন্টে বিপুল পরিমাণ সেনা ও অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে। ফলে ওই ফ্রন্টে ইরানের জন্য নতুন কোনো অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ইরানের সেনা কমান্ডাররা উত্তরাঞ্চলীয় ফ্রন্টগুলোর দিকে মনোনিবেশ করেন। ইরান ও ইরাকের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের সীমান্তে আগ্রাসী সাদ্দাম বাহিনীর তেমন কোনো উপস্থিতি ছিল না। এছাড়া, এসব অঞ্চল দিয়ে ইরাকের অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে আঘাত হানার প্রচুর সুযোগ ছিল।

এদিকে ইরানের ‘রমাজান’ সেনাঘাঁটির সহযোগিতায় ইরাকের উত্তরাঞ্চলে দেশটির কুর্দি যোদ্ধারা গেরিলা অভিযান অব্যাহত রাখে। তারা নতুন নতুন সাফল্য লাভ করে। ওই অঞ্চলে ইরাকি সেনা উপস্থিতি কম থাকায় ইরাকের কুর্দি যোদ্ধারা সাদ্দাম বাহিনীকে বেশ বেকায়দায় ফেলে দিতে সক্ষম হয়।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র পরিকল্পনায় চালানো এসব অভিযানের ফলে কুর্দিস্তান অঞ্চলে ইরানের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ভূখণ্ডগুলো একের পর এক পুনরুদ্ধার হতে থাকে। এ অবস্থায় আইআরজিসি’র পক্ষ থেকে ১৯৮৭ সালের বসন্তে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ কুর্দিস্তান এলাকা দিয়ে কারাবালা-১০ অভিযান চালানো হয়।  ইরাকের সুলাইমানিয়া প্রদেশের মাভুত শহর ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে চালানো এ অভিযানে ইরাকের কুর্দিস্তান প্যাট্রিওটিক ইউনিয়নের যোদ্ধারা আইআরজিসি’কে সহযোগিতা করে। এই অভিযান তুলনামূলক সফল হয় এবং ইরান নিজের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া কিছু এলাকা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি ইরাকের সুলাইমানিয়া প্রদেশের ২৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করতে সক্ষম হয়।

কারবালা-১০ অভিযানে পূর্ব পরিকল্পিত লক্ষ্যগুলো অর্জনের পাশাপাশি পরবর্তী অভিযানের ক্ষেত্রও প্রস্তুত হয়ে যায়। এ পর্যায়ে ইরান ইরাকের সুলাইমানিয়া শহর অভিমুখী কিছু পাহাড়ি এলাকা দখল করতে সক্ষম হয়। আইআরজিসি’র যোদ্ধারা ইরাকের অভ্যন্তরে স্বাধীনভাবে চলাচল করার সুযোগ পেয়ে যান। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কারবালা-১০ অভিযানের খবর ফলাও করে প্রচারিত হয়। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির সাংবাদিক ইরাকের মাভুত এলাকা পরিদর্শনের পর বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে জানান, “ইরাককে দক্ষিণ ফ্রন্টে ব্যস্ত রেখেই ইরান উত্তর ফ্রন্টে অভিযান চালিয়ে বড় ধরনের বিজয় অর্জন করেছে।”

এদিকে ইরানি হামলা প্রতিহত করা হয়েছে বলে বাগদাদ যে দাবি করেছে সে সম্পর্কে সাপ্তাহিক জিন্স ডিফেন্স জানায়, “এই অভিযান (অর্থাৎ কারবালা-১০ অভিযান) প্রতিহত করা হয়েছে বলে ইরাক দাবি করলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ইরান এ অভিযানে সফল হয়েছে এবং ইরানি যোদ্ধারা ইরাকের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তিন থেকে চার কিলোমিটার গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে।

এ সময় এক সাক্ষাৎকারে ইরানের তৎকালীন সংসদ স্পিকার ও যুদ্ধের সর্বোচ্চ কমান্ডার হাশেমি রাফসানজানি বলেন, অতীতে যেমন ফাও উপত্যকা ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে তেমনি এবারের দখলীকৃত এলাকাও ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দিস্তানে প্রবেশের দরজা হিসেবে কাজে লাগবে।

কিন্তু উত্তর ইরাকে ইরানের এই সাফল্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ইরান ইরাকি সেনাদেরকে দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তরে টেনে আনার যে কৌশল হাতে নিয়েছিল তা ইরাকিরা টের পেয়ে যায়। ইরান চেয়েছিল উত্তর ইরাকে কারবালা-১০ অভিযান চালালে সাদ্দাম সরকার দক্ষিণাঞ্চলে মোতায়েন সেনাদেরকে উত্তরের ফ্রন্টে তলব করবে; আর সেই ফাঁকে ইরান দক্ষিণ ফ্রন্টে ইরাকিদের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানবে। কিন্তু ইরাক সরকার তা না করে ইরানি যোদ্ধাদের প্রতিহত করার জন্য দেশের উত্তরাঞ্চলে নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৮৭ সালের মার্চ মাসে কারবালা-৮ অভিযান শুরুর পরপরই ইরাকি বাহিনী সেদেশের শালামচে এলাকায় ভয়াবহ রাসায়নিক হামলা চালায়। এতে শত শত ইরানি যোদ্ধা হতাহত হন।  সাদ্দাম বাহিনী উত্তর ইরাকের সুলাইমানিয়ায় কারবালা-১০ অভিযানে নিয়োজিত ইরানি যোদ্ধাদের উপরও ব্যাপক মাত্রায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে।

১৯৮৭ সালের ১৬ মে ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় সুলাইমানিয়া ও ইরবিল এলাকায় সাদ্দাম বাহিনীর রাসায়নিক হামলায় ৭০ ইরানি যোদ্ধা নিহত ও ৩৮০ জন আহত হন। ইরাকি বাহিনী সম্মুখযুদ্ধে পেরে না উঠে ইরানি সেনাবাহিনীর অগ্রাভিযান প্রতিহত করতে এই নিষিদ্ধ অস্ত্রের আশ্রয় নেয়। বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানায় ইরান। পাশাপাশি ইরাক সরকারও ইরানের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের ভুয়া দাবি উত্থাপন করে জাতিসংঘের কাছে একই ধরনের আবেদন জানায়। বিষয়টি তদন্ত করার জন্য জাতিসংঘের একটি বিশেষজ্ঞ দল ১৯৮৭ সালের ২২ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইরান সফর করে এবং এরপর ২৯ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত ইরাকে পরিদর্শন কাজ চালায়।

জাতিসংঘের ওই বিশেষজ্ঞ দল তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ইরাক সরকার যুদ্ধের ময়দানে ও বেসামরিক এলাকায় হামলার কাজে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। এর ফলে ইরানি সৈন্যদের পাশাপাশি দেশটির বেসামরিক নাগরিকরা হতাহত হয়েছেন। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব পেরেজ ডি কুয়েয়ার ৮ মে প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখার জন্য নিরাপত্তা পরিষদে পাঠান।  জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৮৭ সালের ১৪ মে এক বৈঠকে বসে। ওই বেঠকে জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করার পর এক প্রস্তাবে বলা হয়, “রাসায়নিক হামলায় ইরানের কিছু বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।” বিবৃতিতে ইরাকের নাম উল্লেখ না করে যুদ্ধক্ষেত্রে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানানো হয়।  সাদ্দাম সরাকরের পক্ষে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এই একপেশে ভূমিকায় ইরাক সরকার আরো বেশি ধৃষ্ট হয়ে ওঠে এবং এরপর আরো বেশি মাত্রায় নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ /০৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ