সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২১ ২১:৫১ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি যে যেখানেই আছে ভালো ও সুস্থ আছো? আজকের আসরে তোমাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশীদ এবং আমি আকতার জাহান।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবে যে, চেষ্টা আর সাধনা ছাড়া আজকাল সাফল্য লাভ করা একপ্রকার অসম্ভবই বলা যায়। অবশ্য সবযুগেই পরিশ্রমী ও অধ্যবসায়ী মানুষরাই সফলতার মুখ দেখেছে। আর যারা অলস ও কর্মবিমুখ তারাই ব্যর্থ মানুষ হিসেবে সমাজে পরিচিতি পেয়েছে। সুতরাং মানুষের জীবনের সাফল্যের চাবিকাঠি হলো পরিশ্রম ও চেষ্টা-সাধনা।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সূরা রাদের ১১ নং আয়াতে বলেন : ‘আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো জাতির অবস্থান বদলান না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের বদলে ফেলে। আর যখন কোন জাতিকে দুর্ভাগ্যে নিপতিত করার ফয়সালা করে ফেলেন, তখন কারো রদ করায় তা রদ হতে পারে না।’

বন্ধুরা, পরিশ্রম এবং চেষ্টা-সাধনার গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহর বাণী শুনলে। রংধনুর আজকের আসরে আমরা এ সম্পর্কে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসুতি' বাংলা এ প্রবাদটি জানো। প্রবাদটির অর্থ হচ্ছে পরিশ্রম ও চেষ্টা-সাধনার মাধ্যমেই মানুষ সৌভাগ্য লাভ করে। বিশ্বের ইতিহাসও একথারই সাক্ষ্য দেয়। নবুয়ত পাওয়ার পরপরই মক্কার কুরাইশরা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর বিরুদ্ধে বাধার পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তখন কি হলো? আমাদের প্রিয় নবী কি ঘাবড়ে গেলেন? না, মোটেই না। বরং দ্বিগুণ তেজে বললেন, "ওরা আমার এক হাতে যদি চন্দ্র এবং আরেক হাতে সূর্যকেও এনে দেয় তবু আমার পথ থেকে আমি এক চুল পরিমাণও বিচ্যুত হবো না ৷"

জীবনে এমন কঠিন অঙ্গীকার ছিল বলেই মক্কার সেই কিশোর রাখাল বালকটি বড় হয়ে সমগ্র জাহানের অধিপতি হয়েছিলেন। এত অল্প সময়ে রাসূল (সা.)-এর অবিস্মরণীয় সাফল্যের পেছনে শুধুমাত্র আল্লাহর সাহায্যই নয় বরং তার সুদৃঢ় আকাঙক্ষা এবং চেষ্টা-সাধনাও মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

বন্ধুরা, শুধু সুদৃঢ় আকাঙ্ক্ষা নিয়ে চুপটি করে সোফায় বসে থাকলেই সাফল্য আসবে? না, এক্কেবারে না। তাহলে উপায়? হ্যাঁ, আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করতে চাইলে দরকার চেষ্টা আর সাধনা। একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি তোমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। প্রায় এক হাজার নতুন বিষয়ের আবিষ্কারক বৈজ্ঞানিক এডিসনের মৃত্যুর পর নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় লেখা হয়- "মানুষের ইতিহাসে এডিসনের মাথার দাম সবচেয়ে বেশি। কারণ এমন সৃজনশক্তি অন্য কারো মধ্যে দেখা যায়নি।" অথচ ১৮৭৯ সালের ২১ অক্টোবর তার আবিস্কৃত পৃথিবীর প্রথম বৈদ্যুতিক বাতিটি যখন জ্বলে উঠলো তখন ক'জন জানতো যে বিগত দু'বছরে তিনি এটি নিয়ে প্রায় দশ হাজার বার ব্যর্থ চেষ্টা করে আজ সফল হয়েছেন! সত্যি সাফল্যের পেছনে কি নিদারুণ সাধনা!

এ ব্যাপারে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন ‘তুমি কখনও ব্যর্থ হবে না, যতক্ষণ না তুমি চেষ্টা বন্ধ করছো। অন্যদিকে টি বেনেট বলেন, ‘পরাজয়ের ভয় করো না বরং চেষ্টা না করার ভয় করো।’

বন্ধুরা, আরবি একটি প্রবাদ বাক্যে বলা হয়েছে, ‘চেষ্টা আমাদের পক্ষ থেকে আর পূর্ণতা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে।’ একজন মুমিনের জীবনে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো, নিজের রব আল্লাহকে খুশি করা। আর আল্লাহকে পেতে হলে, তাঁকে খুশি করতে হলে, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। এর জন্য পরিশ্রম করতে হবে। অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

পরিশ্রমের গুরুত্ব সম্পর্কে ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও পরমাণু বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালাম বলেছেন, ‘সূর্যের মতো দীপ্তিমান হতে হলে প্রথমে তোমাকে সূর্যের মতোই পুড়তে হবে। যে স্বপ্ন দেখে উজ্জ্বলতার, ভব্যতার, মরে গিয়ে বেঁচে থাকার, তাকে জলাঞ্জলি দিতে হবে জীবনের কাছে জীবনকে।’

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবে যে, ক্রমাগত চেষ্টা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যে কেউ যেকোনো বয়সে নিজেকে বদলাতে পারে। একজন মানুষের জীবনে সাফল্য পেতে হলে চেষ্টা এবং পরিশ্রম কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে এখন দুটি উদাহরণ তুলে ধরব।

একবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের এক চার্চে বিয়ের অনুষ্ঠানের জমকালো আয়োজন চলছিল। কনে পক্ষের লোকজন উৎসবমুখর পরিবেশে কনেকে নিয়ে আগেই উপস্থিত হয়েছেন। পাত্র পক্ষেরও অনেকেই উপস্থিত। শুধু বর এখনো এসে পৌঁছায়নি। বিয়ের নির্ধারিত সময়ও অনেক আগেই অতিবাহিত হয়েছে। সকলেই অধীর উৎকণ্ঠায় বর আসার অপেক্ষা করছেন। কিন্তু বরের দেখা নেই। চার্চের পাদ্রিও অধৈর্য হয়ে উঠলেন।

 কনের বাবা পাত্রের এক বন্ধুকে ডেকে রাগত স্বরে বললেন, ‘কী ব্যাপার, এখনো তো তোমার বন্ধু এলো না? পথে বিপদ হলো নাতো আবার?

বন্ধু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেলেন, দু’চার জায়গায় খোঁজ করলেন কিন্তু কোথাও বরের দেখা নেই। হঠাৎ মনে হলো, একবার ল্যাবরেটরিতে গিয়ে খোঁজ করে দেখি। যে কাজপাগল মানুষ, বিয়ের কথা হয়তো বেমালুম ভুলে গেছে।

যেই ভাবা সেই কাজ। ল্যাবরেটরিতে গিয়ে হাজির হলেন বন্ধু। টেবিলের সামনে মাথা নিচু করে নিবিড় মনে গবেষণা করে চলছেন বর। চারপাশে কী হচ্ছে তার প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপও নেই। এমনকি বন্ধুর পায়ের শব্দেও তার একাগ্রতা ভাঙল না। আর সহ্য করতে না পেরে বন্ধু এবার রাগে চেঁচিয়ে উঠে বলল, আজ তোর বিয়ে। চার্চে সবাই অপেক্ষা করছেন। তোর উপস্থিতি না দেখে কনে পক্ষের লোকজন বিমর্ষ হয়ে পড়ছেন। আর তুই এখানে বসে বসে কাজ করছিস?

এবার বর বন্ধুর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল- ‘বিয়ের চেয়ে আমার এই গবেষণা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া বিয়ের কথা আমার মনে আছে। কাজটা শেষ করার আগে কীভাবে বিয়ের আসরে যাই?’

বন্ধুরা, এতক্ষণ যার কথা শুনলে তিনি হলেন ফরাসি বিজ্ঞানী ও রসায়নবিদ লুই পাস্তুর।  তার বাবা জোসেফ পাস্তুর প্রথম জীবনে ছিলেন নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর সেনাধ্যক্ষ। ওয়ার্টার ল্যুর যুদ্ধে নেপোলিয়নের শোচনীয় পরাজয়ের পর যোসেফ নিজ গ্রামে এসে ট্যানারিতে কাজ নেন। বাবার সামান্য আয়ে কষ্টেসৃষ্টে কোনো রকম পরিবার চলত। বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলবেন। সেই স্বপ্নকে বৃথা যেতে দেননি লুই পাস্তুর।

পাস্তুর বিজ্ঞানের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করলেও বিনিময়ে যৎ সামান্যই পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। একবার তৃতীয় নেপোলিয়ন তাঁর সামান্য পারিশ্রমিকের কথা শুনে বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘আপনি এই সামান্য অর্থ নিয়ে এত বেশি পরিশ্রম কেন করেন?’ জবাবে পাস্তুর বলেন, ‘একজন বিজ্ঞানী কখনও ব্যক্তি স্বার্থের জন্য কাজ করেন না। মানবকল্যাণই আমার জীবনের লক্ষ্য।’

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, লুই পাস্তুর জলাতঙ্ক রোগ নিরাময়ের ওষধসহ বহু ওষধ আবিষ্কার করেছেন। আত্মভোলা পাস্তুরের জীবনে মোট পাঁচটি বিয়ের আসর ভেঙে গিয়েছিল শুধু তাঁর নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার জন্য। যেদিন মেরির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হলো, সেদিনও প্রায় বিয়ের কথা ভুলতে বসেছিলেন। স্ত্রী মেরি ছিলেন পাস্তুরের যোগ্য সহচরী। স্বামীর সব কাজে আজীবন সাহায্য করে গেছেন ছায়ার মতো। পাস্তুর সম্বন্ধে তৃতীয় নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘পাস্তুর ফ্রান্সের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান।’

বন্ধুরা, এবার আমরা ইরানের একজন পরিশ্রমী ব্যক্তির কথা বলব; যিনি শুধু ফারসি ভাষারই শ্রেষ্ঠ কবি নন, সমগ্র পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম একজন।

হ্যাঁ, আমরা মহাকবি শেখ সা’দীর কথা বলছি। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী এই মহান মনীষীর শিক্ষা লাভের প্রতি ছিল অস্বাভাবিক আগ্রহ। শৈশবেই পিতা-মাতাকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। শুরু হয় সংগ্রামমুখর জীবন। একদিকে সংসার দেখাশোনার ভার, অন্যদিকে জ্ঞানার্জন।

সা’দীর জীবনকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ৩০ বছর শিক্ষালাভ, দ্বিতীয় ৩০ বছর দেশ ভ্রমণ, তৃতীয় ৩০ বছর গ্রন্থ রচনা এবং চতুর্থ ৩০ বছর আধ্যাত্মিক চিন্তা ও সাধনা। এক সময় কর্ডোভার মুসলিম সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্যে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা প্রভাবিত ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শেখ সা’দীর চোখের সামনে দুমড়ে মুচড়ে ধরাপৃষ্ঠ হতে মুছে গিয়েছিল মুসলিম সাম্রাজ্য। বর্তমান ইরাকের রাজধানী বাগদাদ পরিণত হয়েছিল এক মহাশ্মশানে। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ, ‘আল মুকাদ্দিমায়’ লিখেছেন-‘বিশ লাখ অধিবাসীর মধ্যে ষোল লাখ লোকই এ আক্রমণে নিহত হয়েছিল।’

মুসলমানদের এই দুরবস্থা দেখে সা’দী ভীষণভাবে ব্যথিত হন। তাঁর ক্ষুরধার কলম জ্বলে ওঠে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে। রচনা করলেন তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ, ‘গুলিস্তান’। তাঁর প্রায় সমস্ত কাব্যেই তিনি জালিমদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠনের কথা বলেছেন।

শেখ সা’দীর গুলিস্তান ও বোস্তান বিশ্ব কাব্যকাননে এক অমূল্য সম্পদ। এমন গ্রন্থ খুব কমই আছে, যা যুগ যুগ ধরে বিপুলভাবে পঠিত হয়ে আসছে। তাঁর সমস্ত রচনাই অতি সরল, প্রাঞ্জল এবং আবেগধর্মী। আলেম ও ধর্মীয় বক্তারা বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় সভায় তাঁর কবিতা আবৃত্তি করে থাকেন। প্রিয় নবীর শানে কবিতার নিম্নোক্ত এই চারটি চরণ লিখে তিনি চির স্মরণীয় হয়ে আছেন–

‘বালাগাল উলা বিকামালিহি
কাশাফাদ্দুজা বি জামালিহি
হাসুনাত হামিউ খিসালিহি
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।’

শিশুশিল্পী কানিজ ফাতেমা জাকিয়ার কণ্ঠে নাতে রাসূলটি শুনলে। বন্ধুরা, একাগ্রতা, নিষ্ঠা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে মানুষ কীভাবে লক্ষ্য সাধনের পথে এগিয়ে যেতে পারে, তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হলেন আমাদের বিশ্বনবী (সা.)। তোমরাও যদি বিশ্বনবীর মতো সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারো, নিজের দায়িত্ব ও কাজকে নিষ্ঠতার সাথে করতে পারো, সর্বোপরি বুকে সাহস রেখে পথ চলতে পারো তাহলে সফলতার আসবেই। 

"সাহস বুকে রাখো রবকে তুমি ডাকো

কর্ম তোমার সহজ হবে ভেঙ্গে পড়ো নাকো"

হুমায়রা আফরিন ইরার কণ্ঠে প্রেরণামূলক গানটি শুনলে। গানের কথা লিখেছেন গোলাম মোহাম্মদ আর সুর করেছেন মশিউর রহমান। তো বন্ধুরা, তোমরা ভালো ও সুস্থ থেকো আবারো এ কামনা করে গুটিয়ে নিচ্ছি রংধনুর আজকের আসর। কথা হবে আবারো আগামী সপ্তাহে।#

 

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ