সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২১ ২২:৫৮ Asia/Dhaka

ক্ষুধার যন্ত্রণা কেমন তা শুধুমাত্র যারা নিজ জীবনে ভোগ করেছে তারাই কেবল বলতে পারবে ও বুঝতে পারবে আসলে এ কষ্টটা কতটুকু! নিজ জীবনের ক্ষুধা যন্ত্রণার অভিজ্ঞতার বিষয়টি মাথায় রেখেই আরিফা জাহান বিথী অসহায় মানুষের সহায়তার জন্য প্রতিনিয়ত ছুটে বেড়াচ্ছেন। তিনি এ কাজটিকে সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা বলে মনে করেন। একাজের মধ্যে তিনি পান মানসিক শান্তি। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেছেন।

শ্রোতাবন্ধুরা! রেডিও তেহরানের সাপ্তাহিক সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুষ্ঠান আলাপনে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশীদ।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শুরুর দিকে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সেবায় নেমে পড়েন রংপুরের মেয়ে সাবেক ক্রিকেটার আরিফা জাহান বিথী। নিজের খুব বেশি সামর্থ না থাকলেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষ সেবা চালু করেছেন তিনি। তার এ উদ্যোগে আর্থিকভাবে সাড়া দেন জাতীয় দলের কয়েকজন ক্রিকেটার।

২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবরে রংপুর জেলা স্টেডিয়ামে নারীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উইমেন্স ড্রিমার ক্রিকেট একাডেমি নামে প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়ে তোলেন বিথী। সেখানে তিনি রংপুরের ২৫০ জন নারী ক্রিকেটারের কোচের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে অসহায় মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন।

করোনাকালে গর্ভবতী নারীদের পাশে দাঁড়ানো আরিফা জাহান বিথীর সঙ্গে তার মানবিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলেছি। তার সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো।

অসহায় নারীদের কর্মক্ষম করার সেলাই মেশিন কিনে দেন আরিফা জাহান বিথী

রেডিও তেহরান: আরিফা জাহান বিথী, আপনি করোনা প্যানডেমিকের এই দীর্ঘসময় ধরেই দরিদ্র, অসহায় কর্মহীন মানুষ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তো কিভাবে এ মানবধর্মী কাজ শুরু করলেন?

আরিফা জাহান বিথী: ধন্যবাদ আপনাকে সুন্দর একটি প্রশ্ন করার জন্য। যদি অসহায় মানুষদের নিয়ে কাজ করার কথা বলতে যাই তাহলে আমাকে শুরু থেকেই বলতে হবে। আমি ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। স্কাউট, গার্লস গাইড এবং রেড ক্রিসেন্টের সাথে কাজ করেছি দলীয়ভাবে। ফলে সমাজের অসহায় মানুষের জন্য কাজ করার একটা অভিজ্ঞতা আমার আগে থেকেই ছিল।

তবে সবচেয়ে বড় কথা আমার পরিবারিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। এমন সময় গিয়েছে যে আমাদের পরিবারের সবাইকে না খেয়ে থাকতে হয়েছে। এই যে ক্ষুধার যন্ত্রণা এটা শুধুমাত্র যারা নিজ জীবনে ভোগ করেছে তারাই কেবল বলতে পারবে ও বুঝতে পারবে আসলে এ কষ্টটা কতটুকু! তো নিজ জীবনের ক্ষুধা যন্ত্রণার অভিজ্ঞতার বিষয়টি মাথায় ছিল। করোনা প্যানডেমিকের মধ্যে অন্য সবার মতো ঘরেই ছিলাম। কিন্তু আশপাশের মানুষগুলোর কথা আমাকে ভাবিয়ে তুলল। কারণ আমার আশপাশের মানুষগুলো খুবই গরীব দিন মজুর। করোনার সময় তাদের কাজ কর্ম নেই। খুবই খারাপ অবস্থার মধ্যে দিনানিপাত করছিলেন। অনেকের খুবই খারাপ অবস্থা থাকার ফলেও তারা মুখ ফুটে কারও কাছে বলতে পারছিলেন না তাদের কষ্টের কথাগুলো। তাদের খাবার প্রয়োজন, তারা নানামুখী সংকটে আছে এসব কথা কাউকে শেয়ার করছিল না।

অন্যদিকে কেউ যদি তার সমস্যার কথা না বলে তাহলে তো হুট করে কেউ গিয়ে তাকে সহায়তার কথা বলতে পারে না। তখন তাদের বিষয়ে ভাবতে থাকলাম। ভাবতে থাকলাম এই না বলা শ্রেণির কষ্ট কিভাবে দূর করব। আর সেই ভাবনা থেকেই একান্ত নিজের উদ্যোগে- নিজের কাছে জমানো কিছু টাকা দিয়ে শুরু করলাম মানুষকে সেবা দানের কাজ। শুরুতে সেই টাকা দিয়ে একবেলার খাবার রান্না করে নিয়ে ঐসব অসহায় দিনমজুর মানুষের কাছে যাই। তখন আরো একটা বিষয় মাথায় এলো যে একবেলা খাবার দিলে কি হবে! তারপর তো তারা না খেয়ে থাকবে। কিভাবে এটাকে বৃদ্ধি করা যায় সেকথা ভাবতে থাকলাম গভীরভাবে চিন্তা করতে থাকলাম দুখের কথা না বলা মানুষগুলোর পাশে আমাকে দাঁড়াতেই হবে। সেই ভাবনা থেকে আমি আমার ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিলাম এভাবে যে, আমার আশপাশের কোনো মানুষ যদি কোনোরকমের খাবার সংকটসহ অন্য কোনো সমস্যায় পড়ে থাকেন তাহলে আমাকে যেন নিঃশকোচে তাঁদের বিষয়টি শেয়ার করেন। আমার ঐ স্ট্যাটাসে মোবাইল নাম্বারও দিয়েছিলাম এবং ফোন করার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। এরপরই আমার আশপাশের সমস্যাগ্রস্ত কিছু পরিচিত মানুষ আমাকে ফোন দেয় এবং তাদের সমস্যার কথা জানায়। তারা জানায় খাবারের প্রয়োজন। তখন আমি একটি তালিকা তৈরি করে সমস্যাগ্রস্তদের বাসায় গিয়ে এক সপ্তাহের করে খাবার পৌঁছে দিলাম।

রেডিও তেহরান: আরিফা জাহান বিথী, গর্ভবতী নারীদের নিয়ে কাজ করার চিন্তা আপনার মনে কখন, কিভাবে এলো?

আরিফা জাহান বিথী: যখনই গরীব অসহায়দের মাঝে এক সপ্তাহের করে খাবার দিচ্ছিলাম তখনই একজন গর্ভবতী বোন আমাকে ফোন করেন। সে এতটুকুই আমাকে জানিয়েছিল যে সন্তানসম্ভবা। তার স্বামীর চাকরি নেই। এ সময়টাতে তার খুব খাবারের কষ্ট হচ্ছে। একথা শোনার পর আমার মনে খুব বেশি দাগ কাটে, আমি কষ্ট অনুভব করি। কারণ একজন নারী যখন গর্ভবতী হয় তখন তাকে পুষ্টিকর ভালো খাবার দিতে হয়। সেখানে ঐ মা হতে যাওয়া নারী বোনটি খাবার কষ্টে আছেন এটি আমাকে আহত করে। আমার কাছে আরও মনে হলো একজন গর্ভবতী নারী আমাকে ফোন করেছে খাবার কষ্টের কথা জানিয়ে সেক্ষেত্রে আরো অনেক নারী এমন থাকতে পারে। আমি ঐ বোনের ফোন পাওয়ার পরপরই তাঁকে একমাসের খাবার দিয়ে আসি। তাঁর খাবারে পুষ্টিগত দিকের কথা ভেবে ডিম, দুধ থেকে শুরু করে যা কিছু প্রয়োজন সবকিছু দিয়ে এসেছি।

তারপর আমি আবার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেই যে- এক কলে পৌঁছে যাবে গর্ভবতী মায়েদের কাছে বিনামূল্যে খাদ্য। তার পরদিন থেকে এরকমের অনেক গর্ভবতী বোনের ফোন পেতে থাকি। আর তখন থেকেই গর্ভবতী মায়েদের একটা লিস্ট করে সত্যিকার নিডি সন্তানসম্ভাবা মায়েদের কাছে খাবার পৌঁছে দিতে থাকি।

খাবার বিতরণ করছেন আরিফা জাহান বিথী

রেডিও তেহরান: গর্ভবতী মা'দের পাশাপাশি আর কাদের এবং কী ধরণের সহযোগিতা করছেন?

আরিফা জাহান বিথী: দেখুন, আসলে আমি গর্ভবতী মা’দের যে শুধু সহযোগিতা করছি তা নয়। পাশপাশি দিনমজুর, অসহায়, কর্মহীন মানুষ, শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করেছি এবং করছি। করোনা প্যানডেমিক শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত নানাভাবে আমি অসহায়দের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। করোনায় আক্রান্ত রোগী যাদের শ্বাসকষ্ট হয়- তাদের জন্য অক্সিজেন সেবার ব্যবস্থা করেছি। অসহায় বৃদ্ধ মা-বাবাদের থাকার ঘর বাড়ি তৈরি করে দিয়েছি। বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত কিংবা অসহায় নারীদের কর্মক্ষম করার জন্য তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। তাদেরকে সেলাই মেশিন প্রশিক্ষণ দিয়ে সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছি। করোনাকালে অনেক গরীব পরিবারের কিংবা চাকুরি হারানো পরিবারের যখন চলার সঙ্গতি নেই তখন অনেক পরিবারকে মুদিখানার দোকান করে দিয়েছি। অর্থাভাবে যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতে পারছিল না তাদেরকে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছি। এর বাইরে আরও অনেক কাজ করেছি।

রেডিও তেহরান: আপনার এ কাজের আর্থিক যোগানটা কোথা থেকে আসে?

আরিফা জাহান বিথী: দেখুন, শুরুতে আমার কাজের জমানো কিছু টাকা দিয়ে মানবিক সহায়তার কাজ শুরু করি। পরবর্তীতে আমার কাজগুলোকে দেখে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন আমাকে এসব কাজের জন্য অর্থ সহায়তা দিয়েছে। মানুষের দেয়া সেই অর্থ আমি মানুষের কাজে লাগিয়েছি।

রেডিও তেহরান: ক্রিকেটের পাশাপাশি মানবসেবার মহান কাজটির সূচনা কিভাবে করলেন?

আরিফা জাহান বিথী: ২০১৯ সালে আমি নারীদের জন্য একটা ক্রিকেট অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করি। সবাই আমার এ কাজের বিষয়টি জানতে পারে। এর কিছুদিনের মধ্যেই করোনা প্যানডেমিক শুরু হয়। যেহেতু আমার ছোটোবেলা থেকে মানবসেবার কাজ করে এসেছি তাই ক্রিকেটের পাশাপাশি মানবসেবার কাজটি খুব কষ্টদায়ক না। কারণ ক্রিকেট একাডেমিতে বিকাল তিনটা থেকে ৬ টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ হয়। বাকি সময়টাতে আমি মানুষের কাছে ছুটে বেড়াই। চেষ্টা করি অসহায় মানুষদের পাশে কিভাবে দাঁড়াতে পারব। আমার ভাবনায় সবসময় এমনটি থাকে একটি অসহায় মানুষকে কিভাবে স্বাবলম্বী করতে পারব। আর এসব কাজ করা সম্পূর্ণভাবে আত্মতৃপ্তির জায়গা থেকে। আমি মনে করি এসব কাজ সমাজের জন্য আমার একধরনের দায়বদ্ধতা। আমার পরিবেশের, বাড়ির আশপাশের মানুষের খোঁজখবর রাখা, বিপদে আপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আর সেই দায়বদ্ধতা এবং দায়িত্ব ও নৈতিকতার জায়গা থেকে অসহায় মানুষদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করি সবসময়।

ত্রাণ দিচ্ছেন আরিফা জাহান বিথী

শ্রোতা/পাঠক বন্ধুরা! আমরা কথা বলছিলাম আরিফা জাহান বিথীর সাথে। গেল দেড় বছরে পাঁচ হাজারের বেশি অসহায়, দুস্থ, কর্মহীন মানুষের পাশাপাশি সন্তানসম্ভবাকে সেবা দিয়েছেন সাবেক এ ক্রিকেটার। নিজের জমানো টাকা আর অন্যের সহযোগিতার সমন্বয়ে কয়েক হাজার মানুষের দুয়ারে চাল, ডাল, তেল, লবণ, ফল, দুধ, ডিম ও হরলিকসসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। রমজানেও অসহায় ব্যক্তিদের হাতে হাতে ইফতার পৌঁছে দিয়েছেন তিনি।

এবারের ঈদুল আযহায় বিভিন্ন জনের সহযোগিতায় তিনটি গরু ও তিনটি খাসি কোরবানি দিয়ে ঈদের দিনই বাড়ি বাড়ি গিয়ে ৭০০ পরিবারে মাংস পৌঁছে দিয়েছেন। অসহায় শীতার্তদের মাঝে  শীতবস্ত্র দিয়েছেন। গরীবদেরকে গরু ছাগল কিনে দিয়ে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করেছেন। বলা চলে মানবিক ছোঁয়াধর্মী এমন কিছু নেই যা তিনি করছেন না।

তো আরিফা জাহান বিথী করোনা প্যানডেমিকের সময় নানাভাবে অসহায় মানুষদের পাশে থেকে যে মানবিক কাজ করছেন সেজন্য  অনেক অনেক ধন্যবাদ। একইসাথে রেডিও তেহরানকে সময় দেয়ার জন্যও আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।#

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ, উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৯

 

ট্যাগ