সেপ্টেম্বর ১১, ২০২১ ১৮:৪৪ Asia/Dhaka

ইরানকে সম্মুখ সমরে প্রতিহত করতে না পেরে আগ্রাসী ইরাকি বাহিনী যেসব অমানবিক পদক্ষেপ নেয় তার মধ্যে নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার ছিল অন্যতম।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার ক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছিল বাগদাদের স্বৈরশাসক সাদ্দাম তত বেশি রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে যাচ্ছিল। ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় সোলায়মানিয়া শহরের কাছে ইরান কারবালা-১০ অভিযান চালানোর পর প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম ওই এলাকায় রাসায়নিক হামলা চালানোর নির্দেশ দেন যাতে ইরানি যোদ্ধারা তাদের দখলীকৃত এলাকা ত্যাগ করে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ১৯৮৭ সালের বসন্তে কারবালা-১০ অভিযান চালানোর পর ইরানের অনুরোধে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকরা অভিযানের এলাকা পরিদর্শন করেন। তারা জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে এক প্রতিবেদনে জানান, সাদ্দাম সরকার যুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং এ হামলা থেকে বেসামরিক নাগরিকও রক্ষা পায়নি।

জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব জ্যাভিয়ার পেরেস ডি কুয়েয়ার প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু নিরাপত্তা পরিষদকে অবহিত করেন। কিন্তু জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যদেশ আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও চীন রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য সাদ্দাম সরকারকে দায়ী না করে ওই হামলার নিন্দা জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করে। বিশ্বের পাঁচ শীর্ষ শক্তির এই নির্লিপ্ত ভূমিকা সাদ্দাম সরকারকে আরো বেশি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারে বেপরোয়া করে তোলে। ইরান ১৯৮৭ সালের ২২ জুন নাস্‌র-৪ অভিযান শুরু করার পর ইরাক সরকার ইতিহাসের অন্যতম বিপর্যকর রাসায়নিক হামলা চালায়। ইরাকি বাহিনী ২৮ জুন ইরানের সারদাশ্‌ত শহরের চারটি এলাকায় নিষিদ্ধ মাস্টার্ড গ্যাসের বোমাবর্ষণ করে। হামলায় শত শত মানুষ হতাহত হয় এবং প্রাণে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো এরপর বহু বছর ধরে ওই রাসায়নিক গ্যাসের প্রভাবে মারাত্মক কষ্ট বহন করে বেড়ায়।

এমনকি ওই বোমাবর্ষণের পর জন্মগ্রহণকারী বহু শিশুও ওই গ্যাসের প্রভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহণ করে।  তখন পর্যন্ত এ ধরনের বোমার সঙ্গে অপরিচিত যেসব মানুষ বোমার আঘাতে ধসে পড়া ঘরবাড়ির নীচে চাপা পড়া লোকজনকে উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন তারাও এই গ্যাসের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হন। কিন্তু এত কষ্টের চেয়েও বেশি বিপর্যয়কর ছিল সাদ্দাম সরকারের এই ভয়াবহ অপরাধযজ্ঞের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সমাজের নির্লিপ্ততা।

ওই হামলার পর জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স সারদাশত শহর পরিদর্শনের জন্য প্রতিনিধিদল পাঠাতে জাতিসংঘ মহাসচিবকে অনুরোধ করেন। কিন্তু ডি কুয়েয়ার সে অনুরোধ উপেক্ষা করেন। ইরানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর বেলায়েতি তার দেশের সারদাশত শহরে পরিদর্শক দল না পাঠানোয় জাতিসংঘের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকির পর সারদাশতকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের হামলার শিকার তৃতীয় শহর হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।

কিন্তু জাতিসংঘ ইরাক সরকারের পক্ষে এতটাই একচোখা নীতি অবলম্বন করে যে, ইরানের শত অনুরোধ সত্ত্বেও সারদাশত পরিদর্শনে কোনো প্রতিনিধিদল পাঠায়নি। ইরাক সরকার আট বছরের যুদ্ধে চালানো ২৪২টি রাসায়নিক হামলায় প্রায় ছয় হাজার নিষিদ্ধ বোমা নিক্ষেপ করে। এসব হামলার খুব কম সংখ্যক খবরই পশ্চিমা গণমাধ্যম প্রকাশ করে। ইরাক সরকার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ সংক্রান্ত জেনেভা প্রটোকলে স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও এসব হামলা চালায়। আন্তর্জাতিক সমাজের নীরবতার সুযোগে সাদ্দাম বাহিনী ইরানের উপর রাসায়নিক হামলা অব্যাহত রাখে। নাসর-৪ অভিযানে অংশগ্রহণকারী ইরানি যোদ্ধাদের পাশাপাশি সারদাশত শহরের আশপাশের কয়েকটি গ্রামের উপরও রাসায়নিক বোমা নিক্ষেপ করে ইরাকি সেনারা। এর ফলে আরো বহু মানুষ হতাহত হয়।

ইরানি যোদ্ধারা ওয়ালফাজর-১০ অভিযান চালিয়ে ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় হালাবজা শহর দখল করে নিলে সাদ্দাম বাহিনী নিজ দেশের কুর্দি অধ্যুষিত ওই শহরের ওপর ইতিহাসের ভয়াবহতম রাসায়নিক হামলা চালায়। শহরের যে এলাকায় রাসায়নিক বোমাবর্ষণ করা হয় সেখানকার মোট নয় হাজার অধিবাসীর মধ্যে পাঁচ হাজার মানুষই গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে নিহত হন। এ ঘটনার পর ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান হালাবজায় রাসায়নিক হামলাকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাকের সবচেয়ে বড় যুদ্ধাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে। পত্রিকাটি এক বিশ্লেষণে জানায়, দু’টি উদ্দেশ্য নিয়ে সাদ্দাম বাহিনী এ অপরাধযজ্ঞ চালিয়েছে। এর একটি হচ্ছে, ইরাকের ভেতরে ইরানি যোদ্ধাদের অগ্রাভিযান প্রতিহত করা এবং দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ইরাকের কুর্দি জনগোষ্ঠীকে দমন করা।

এবার হালাবজায় রাসায়নিক হামলার পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই শহর পরিদর্শনে প্রতিনিধিদল পাঠানোর জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানায়। কিন্তু জাতিসংঘের মহাসচিব দাবি করেন, হালাবজা ইরান সীমান্তের অভ্যন্তরে অবস্থিত না হওয়ায় সেখানে লোক পাঠাতে আইনি বাধা রয়েছে। এর মাধ্যমে ইরাকি বাহিনীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধাপরাধকেও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ উপেক্ষা করে। ইরাকি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের তৎকালীন প্রধান মেজর জেনারেল রফিক সামেরাই হালাবজা হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ৫০টি জঙ্গিবিমান হালাবাজার রাসায়নিক হামলায় অংশ নেয়। প্রতিটি বিমান চারটি বোমা বহন করে এবং সরাসরি সাদ্দামের নির্দেশে এ হামলা চালানো হয়। ইরাকি শাসক সাদ্দাম যুদ্ধ জয়ের ব্যাপারে হতাশ হয়ে এই কাপুরুষোচিত অপরাধযজ্ঞ চালায়।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ /১১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ