সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ ২১:১৬ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি যে যেখানে বসে অনুষ্ঠান শুনছো সবাই ভালো ও সুস্থ আছো। আজকের আসরে তোমাদের স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশীদ এবং আমি আকতার জাহান।

বন্ধুরা, আজকের আসরে তোমাদের জন্য রয়েছে বাঘ ও শিয়ালের দুটি গল্প। গল্পের পর থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে প্রথমেই বোকা বাঘ ও চালাক শিয়ালের গল্পটি শোনা যাক।

এক জঙ্গলে বাস করত এক বাঘ। সে খুব বোকা ছিল। তার নিজের কোনো বুদ্ধি ছিল না। তার সাথে বাস করত এক দুর্দান্ত চালাক শিয়াল। শিয়ালের বুদ্ধিতে বাঘ চলতো। আর বাঘের সব কাজকর্ম শিয়ালকেই করতে হতো। তার বদলে বাঘ শিয়ালকে বন্যহরিণ বা অন্যপ্রাণী মেরে খেতে দিত। 

এভাবে দিনের পর দিন যেতে লাগল। বাঘের প্রতি শিয়ালের খুব রাগ জন্মাল। মনে মনে ভাবল- ‘এভাবে অন্যের অধীনে আর কত দিন থাকব। এবার এর নিস্তার চাই। বাঘকে কোনো রকমে ফাঁদে ফেলে মেরে ফেললেই আমার নিস্তার।’ 

পরের দিন শিয়াল বাঘকে তার বাড়িতে খানা খাওয়ার নেমন্তন্ন করল। খানার কথা শুনে বাঘ তো মহাখুশি। শিয়ালের কথামতো বাঘ পরের দিন সকালে তার বাড়িতে এসে হাজির। শিয়াল বাঘের জন্য হরিণ মেরে তাতে লঙ্কা মরিচগুঁড়ো মাখিয়ে দিল। হরিণের গোশত খেয়ে বাঘ ঝালে হু-হা হু-হা করতে করতে এক দৌড়ে নদীতে ঝাঁপ দিল। আর মনে মনে ভাবল, শিয়ালটাকে উচিত শিক্ষা দেবে। 

পরের দিন বাঘও শিয়ালকে তার বাড়িতে খানা খাওয়ার নেমন্তন্ন করল। শিয়ালের মতো বাঘও একই ব্যবস্থা করে রাখল। আর এ দিকে চতুর শিয়াল বাঘের বাড়ি না গিয়ে কিছু দিনের জন্য আড়ালে থাকার সঙ্কল্প করল। তাই সে অন্যত্র চলে গেল। বাঘ তার জন্য অপেক্ষা করে না আসতে দেখে শিয়ালের বাড়ি গেল। তার বাড়িতে এসে দেখে সে নেই। অনেক ডাকাডাকির পর কোনো সাড়া না পেয়ে বাঘ রেগেমেগে আগুন হয়ে বাড়ি ফিরল। আর ভাবল শিয়ালটাকে পেলে আস্ত গিলে খাবে। ধীরে ধীরে বাঘের রাগ কমতে লাগল। কিছু দিন পর শিয়াল বাঘের সামনে এসে হাজির হলো। 

চতুর শিয়াল বাঘের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে বলল, তার জরুরি কাজ থাকায় সেদিন তার নেমন্তন্নে আসতে পারেনি, তাই সে দুঃখিত। বাঘ তাকে ক্ষমা করে পুনরায় কাছে টেনে নিল এবং পরের দিন আবারো তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করল। আর বলে দিল, যদি কোনো রকমে টালবাহানা করে তবে তার নিস্তার নেই। 

বাঘের কথায় রাজি হয়ে শিয়াল পরের দিন তার বাড়ি এলো। তার জন্য মস্তবড় হাড় রাখল। তারা দু’জন হাড় চিবাতে শুরু করল। বাঘ তো মনের সুখে হাড় চিবাতে লাগল। কিন্তু হাড় চিবাতে গিয়ে শিয়ালের একটি দাঁত ভেঙে গেল। শিয়ালের দাঁত ভাঙতে দেখে বাঘ তো মনে মনে হেসে কুটিকুটি। ভাবল, হতচ্ছাড়াটার উচিত শিক্ষা হয়েছে। অপর দিকে শিয়াল রাগে দাঁত কড়মড় করে মনে মনে বলল- এই বাঘের বাচ্চাকে যত দিন না উচিত শিক্ষা দিতে পারব; তত দিন আর এই জঙ্গলে ফিরব না। 

এই বলে সে এই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে লোকালয়ের ধারে অন্য জঙ্গলে চলে গেল। জঙ্গলের পাশেই গেরস্তের প্রচুর আখক্ষেত ছিল। শিয়াল মনের সুখে আখ ভাঙত আর খেতো। এমন করে আখক্ষেত প্রায় সাবাড় করে ফেলল। আর আখক্ষেতের মালিকেরা রাগে চোর ধরার জন্য খাঁচা দিয়ে ফাঁদ পাতল। কেউ ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই খাঁচার দরজা আটকে যাবে, এমন ব্যবস্থা করল। চতুর শিয়াল লুকিয়ে সব শুনছিল। সব শুনে মনে মনে ভাবল- এই তো সুযোগ বাঘকে উচিত শিক্ষা দেয়ার। তাই সে জলদি করে ওই জঙ্গলে চলে গেল এবং বাঘকে বলল, রাজার ছেলের বিয়ে তাই রাজা বাঘের জন্য পালকি পাঠিয়েছে। 

পালকির কথা শুনে বাঘ বিলম্ব না করে তড়িঘড়ি করে শিয়ালের সাথে রওনা হলো। হাঁটতে হাঁটতে তারা খাঁচার কাছে এসে হাজির হলো। বড়সড় সুন্দর খাঁচাকে পালকি ভেবে বাঘ ত্বরা করে খাঁচার ভেতর প্রবেশ করল। আর অমনি খাঁচার দরজা আটকে গেল। শিয়াল বাইরে থেকে অট্টহাসি হেসে বলল- যাও মামা! ইচ্ছেমতো পেটভরে বিয়ের খানা খেয়ো। আমি চল্লুম...।

বাঘ বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নানান কাকুতি-মিনতি করল। কিন্তু শিয়াল কর্ণপাত না করে জঙ্গলে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর গেরস্তেরা এলো। খাঁচার ভেতরে বন্দী বাঘকে দেখে তারা লাঠিসোটা নিয়ে বাঘের ওপর চড়াও হলো। সবশেষে বাঘ আধমরা হয়ে খাঁচা ভেঙে তার জঙ্গলে পালাল। বাঘ রেগেমেগে আগুন হয়ে সিদ্ধান্ত নিলো শিয়ালকে সামনে পেলেই মেরে ফেলবে। কিন্তু পরক্ষণে ভাবল, তাকে কৌশলে মারতে হবে। 

পরের দিন বাঘ শিয়ালের কাছে গেলে বাঘকে দেখে শিয়াল হাউমাউ করে মায়াকান্না করে তার পায়ে লুটিয়ে পড়ল। বাঘ তাকে ক্ষমা করে পুনরায় তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করল। আর শিয়ালকে মারার জন্য গাছের ওপরে জালের ফাঁদ পেতে রাখল। পরের দিন সকালে শিয়াল যখন জঙ্গলে হেঁটে বাঘের বাড়ি যাচ্ছিল; অমনি বাঘ জাল ফেলে শিয়ালকে বন্দী করে ফেলল। তাকে বন্দী করতে পেরে বাঘ তো মহাখুশি। ভাবল এক্ষণি তাকে মেরে ফেলবে। 

চতুর শিয়াল তৎক্ষণাৎ বুদ্ধি বের করে বলল, বাঘের জন্য সে বিশাল বড় উপহার রেখেছে। আর সেটা হলো তার জন্য খরগোশ ও হরিণ মেরে রেখেছে। খাবারের লোভে বোকা বাঘের জিবে জল এসে গেল। তাই সে শিয়ালকে মুক্ত করে দিলো। মুক্ত হয়ে শিয়াল বাঘকে মারার নতুন ফন্দি আঁটল। তাই সে বাঘকে তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করল।

শিয়াল জঙ্গলের ভেতরে পুরোনো একটি কুয়ার সন্ধান পেল। সে বুদ্ধি করে কুয়ার ওপরে একটি মাদুর বিছিয়ে দিল। পরের দিন শিয়াল বাঘকে সাথে করে নিয়ে এল এবং মাদুরের ওপর বসতে বলল। 

বাঘ যেই মাত্র মাদুরে বসল, অমনি সে ধপাস করে কুয়ার ভেতরে পড়ে গেল। কুয়াটি পুরোনো বিধায় ময়লায় প্রায় ভরাট হয়ে গিয়েছিল। তাই বাঘ পানি খেয়েও প্রাণপণে বেঁচে গেল। বাঘ আবারো রেগে আগুন হয়ে গেল। শিয়াল বাঘের মাথা ঠাণ্ডা করার জন্য হরিণের গোশত নিয়ে তার বাড়িতে গেল। 

ফেরার পথে নদীতে পানি খাওয়ার জন্য গেল। নদীর তীরে বড় একটা কুমির ভাসতে দেখে পুনরায় বাঘের কাছে ফিরে এলো এবং তার জন্য নৌকা তৈরি করেছে বলে ফুঁসলিয়ে নদীর তীরে নিয়ে এলো। বাঘ তীরে এসে ওটাকে নৌকা ভেবে তার ওপর চড়ে বসল। আর দুষ্টু কুমির বাঘকে নিয়ে নদীর মাঝখানে গেল। সেখানে নিয়ে বাঘকে মেরে খেয়ে ফেলল। বাঘকে মরতে দেখে পাজি শিয়াল নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে গেল...।

বন্ধুরা, এ গল্পটি থেকে আমরা শিখতে পারলাম যে, দেহে বল থাকলেই সব কিছু করা যায় না; বরং মাথায় বুদ্ধি থাকলে ছোট্ট প্রাণীও অনেক কিছু করতে পারে। সুতরাং আমাদের উচিত, সবার আগে মাথা খাটিয়ে ভেবেচিন্তে কোনো কাজে অগ্রসর হওয়া।

বন্ধুরা, এবার আমরা এক বুড়ো বাঘ ও শিয়ালের গল্প শোনাব। এক বনে এক বুড়ো বাঘ ছিল। এক সময় বাঘটি রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুখে পড়ে প্রায় মরার মতো অবস্থায় একটি গাছের নিচে শুয়ে শুয়ে কান্না করছিল। সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক শিয়াল। বাঘ শিয়ালকে দেখে আকুতি মিনতি করে ডাকতে লাগল একটু কথা শোনার জন্য।

শিয়াল বলল, মামা, যা বলার তুমি দূর থেকেই বলো। তোমার কাছে যেতে আমার ভয় লাগে।

বাঘ বলল, বিশ্বাস করো শিয়াল- আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না। আমি কথা দিচ্ছি তোমাকে।

শিয়াল বলল: মামা, তুমি কথা দিলেও আমার ভয় হয় তোমার কাছে যেতে!

বাঘ বলল: আমি বুড়া হয়ে গেছি। অসুখে বিসুখে ভুগে মারা যেতে বসেছি। মারা যাবার আগে দীর্ঘজীবনে যা দেখেছি শুনেছি তা তোমাকে বলে যেতে চাই। তুমি বুদ্ধিমান। তুমি আমার জীবনের এই কথা অন্য পশুদের বলবে। তাতে তারা তাদের জীবনে অনেক উপকার পাবে। মৃত্যুর আগে এই আমার শেষ ইচ্ছা। আমি আমার পিতা-মাতার নামে শপথ করে বলছি, আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না। আমার সেই শক্তি আর নেই।

এসব কথা শুনে অনেক ভেবেচিন্তে বাঘের কাছে গেল শিয়াল। তারপর প্রশ্ন করল, এবার বল শুয়ে শুয়ে একা কেন কাঁদছিলে?

বাঘ বলল, মনের দুঃখে মনের দুঃখে। এই বুড়ো বয়সে অসুখে ভুগে আজ সাতদিন ধরে গাছের নিচে পড়ে আছি। দলের বাঘরা আমাকে ফেলে চলে গেল। তারপর বনের কত পশুকে ডাকলাম আমাকে সাহায্য করার জন্য। কেউ সাহস করে এগিয়ে এলো না। এই বুড়ো বয়সে অপরের সাথে কথা-গল্প করতে পারলে মনে বড় শান্তি লাগে। কত পশু-পাখিকে অনুরোধ করলাম, কেউ আমাকে বিশ্বাস করল না। কেউ ফিরে তাকাল না! তাই আমার জীবনের কিছু কথা তোমাকে বলে যেতে চাই।

একটু দম নিয়ে বাঘ আবার বলতে লাগল: “ক্ষমতার ওপর ভর করে খুব বেশি দিন কাউকে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা যায় না। ক্ষমতা কোন সম্পদ নয়- জ্ঞানই প্রকৃত সম্পদ। জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান মানুষকে সবাই ভালোবাসে। তুমি জ্ঞানী-বুদ্ধিমান। তাই তোমাকে সবাই ভালোবাসে- শ্রদ্ধা করে। শান্ত ভদ্রকেও সবাই ভালবাসে- আদর করে। হরিণ শান্ত-ভদ্র। তাই সবাই তাকে ভালোবাসে- আদর করে। যারা ক্ষমতার দাপট দেখায় তাদের ভয় করে ঘৃণা করে। তাই আজ আমার এ অবস্থা।”

বন্ধুরা, এ গল্পের মূলকথা হলো- ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতা দিয়ে খুব কম সময়ই অন্যকে দমিয়ে রাখা যায়।

বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে রয়েছে মাকে নিয়ে একটি গান। গানের কথা লিখেছেন তারিক আবেদিন ইমন, সুর করেছেন লিটন হাফিজ চৌধুরী আর গেয়েছে জাইমা নুর, নাবিহা নূর, মাহদিয়া, সোবহান, জারা, ওসমান ও তাদের বন্ধুরা।

ছোট্টবন্ধুদের কণ্ঠে চমৎকার গানটি শুনলে। আশা করি ভালো লেগেছে। তো বন্ধুরা, তোমরা ভালো ও সুস্থ থেকো আবারো এ কামনা করে গুটিয়ে নিচ্ছি রংধনুর আজকের আসর।  কথা হবে আবারো আগামী আসরের। ততক্ষণ পর্যন্ত সবাই ভালো ও সুস্থ থেকো।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 


 

ট্যাগ