সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২১ ২১:১৬ Asia/Dhaka

ইরানের কালজয়ী গল্পের পসরা "গল্প ও প্রবাদের গল্প"

আজকের আসরে আমরা শুনবো কালজয়ী একটি ফার্সি গল্প: ডাল দেখেছো জাল দেখো নি!  কাহিনীটা হলো, একটি কাক বাসা বেঁধেছিলো পার্বত্য বাগানের ঠিক মগডালে। পাখিদের একটা সুবিধা হলো উপর থেকে নীচের এবং চারপাশের সবকিছু দেখতে পায়। কিন্তু কতোটা সূক্ষ্ম কিংবা যথার্থ দেখতে পায় সেটা বলা মুশকিল। তবে উপর থেকে অনেক পাখিই নীচের প্রাণী শিকার করে। অনেক পাখি পানির ভেতরে থাকা মাছও শিকার করে। এরকম এক শিকারী পাখি হলো ঈগল।

কাক যেখানে বাসা বেঁধেছিলো তারই পাশে পাহাড়ের উপরে একেবারে চূড়ায় ছিলো একটি ঈগলের বাসা। ঈগল প্রতিদিনই পাহাড়ের চূড়া থেকে উড়ে যায় অনেক উপরে। কাক ভাবে, ঈগলের মতো যদি অনেক উপরে উড়তে পারতাম...! বহুবার চেষ্টাও করেছে সে কিন্তু পারে নি। না পারলে কী হবে, চোখের প্রশান্তি মেটাতে সে প্রতিদিনই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে ঈগলের উর্ধ্বাকাশ পাড়ি। মনে মনে ভাবে অত উপর থেকে কী দেখে ঈগল, কী সুখ পায় বিশাল বিস্তৃত দুটি ডানা মেলে বৃত্ত রচনা করে।

কাক যেমন ঈগলকে প্রতিদিন দেখে ঈগলও প্রতিদিন আকাশে পাড়ি জমাতে গিয়ে কাকের চেয়ে থাকা টের পায়। উড়তে উড়তে এখন মাঝে মাঝে কাকের কথাও ভাবে। কিন্তু ভেবে লাভ কী! ঈগল সরাসরি একদিন উড়াল দিয়ে একেবারে কাকের বাসায় এসে হাজির হলো। ভীষণ খুশি হলো কাক। খুশিতে সে যে কী করবে বুঝে উঠতে পারছিলো না। কাকের অপ্রস্তুত অবস্থার ভেতরেই ঈগল তাকে জিজ্ঞেস করলো: অবাক হয়েছো,না?

কাক সে উত্তর না দিয়ে বললো: আমি প্রতিদিন তোমার উড়াল দেওয়া দেখি, খুব ভালো লাগে আমার। কী সুন্দর করে তুমি আকাশে উড়াল দাও...! আমি যদি তোমার মতো এরকম অনেক উপরে আকাশে উড়তে পারতাম...!

ঈগল দেখলো কাক সম্মান দিয়ে কথা বলছে...সে খুশি হলো। বললো: কাক কি আর ঈগলের মতো উড়তে পারে? কাক বললো: তাতো বটেই। কিন্তু আশা করতে তো দোষ নেই, তাই না! এই যে ইচ্ছা পোষণ করেছি তাতেই আমি খুশি। আচ্ছা! তুমি যে এতো উপরে যাও আমার বাসা, এই গাছপালা কিংবা গাছপালার চারপাশের যমিনকে কী রকম দেখো? ঈগল বললো: আমি যে কেবল উড়তেই পটু তাই না, দেখার ক্ষেত্রেও আমি ভীষণ সূক্ষ্মদর্শী। অনেক দূর পর্যন্ত আমি সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাই। আমি যে অতো উপরে যাই সেখান থেকেও চড়ুই পাখির বাসায় পেড়ে রাখা ডিম দেখতে পাই সহজেই। এমনকি মাটিতে পড়ে থাকা ছোট্ট শস্যদানাটিও ভালোভাবে দেখতে পাই, কোনো অসুবিধা হয় না। 

যতো চমৎকার করেই ঈগল তার দূরদৃষ্টির বর্ণনা দিক না কেন, কাকের কাছে ততোটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। সে তাই ঈগলকে জিজ্ঞেস করলো: ঠিকাছে, বলো তো, ও..ই সুদূরে, তুমি কী দেখতে পাচ্ছো?

ঈগল খুব ভালোভাবে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পেলো না। কিন্তু সে কথা কাককে বললে তো আর চলে না। সে যে মহান ঈগল। সব দেখতে পায়। আকাশে উড়তে উড়তে চড়ুই পাখির ছোট্ট ডিমটি পর্যন্ত। চালাকি করে সে বললো: ও, ওখানে, ওখানে তো দেখছি কিছু শস্যদানা পড়ে আছে।

কাক যতোই তার চোখ মেললো আর বুজলো, কিছুই দেখতে পেল না। ঈগলকে বললো: চলো, দেখে আসি। তোমার সাথে আমিও যাবো। আমার সকল শক্তি দিয়ে তোমার পেছনে পেছনে উড়ে যাবো।

ঈগল রাজি হলো। একসাথে দুজনেই দিলো উড়াল। কিন্তু কাক তো আর উড়ালে ঈগলের সাথে পারে না। সে পেছনে পড়ে গেল। ঈগল ভাবতে লাগলো অ্যাতো দূরের পথে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও গম বা ডাল বুটের দানা দেখতে পাওয়া যাবেই। আর সেখানেই নেমে গিয়ে কাককে বলবে ‘এগুলোই আমি দেখেছিলাম’। ঈগল শস্যদানা খুঁজতে অনেক নীচে নেমে এসে উড়তে লাগলো। এই ভেবে উড়তে উড়তে একটু পরেই তার নজরে পড়লো কিছু শস্যদানা। মনের আনন্দে শূন্যেই একটা ঘূর্ণি মেরে দেখে নিলো কাক কদ্দুর এসেছে। না, কাক আসলে কাকই, ঈগল তো নয়, অনেক পেছনে পড়ে আছে। কিন্তু ঈগলের তো এখন দেরি সহ্য হচ্ছে না। সে উপর থেকে সোজা নীচে নেমে আসতে চাইলো শস্যদানাগুলোর কাছে। তার আগে আরেকবার কাকটাকে দেখে নিলো এবং বোঝানোর চেষ্টা করলো সে কোথায় নামতে যাচ্ছে।    

ঈগল শস্যদানার কাছে যেতে নীচে নেমে আসতেই তার পাগুলো কীসে যেন আটকে গেল। পা ছাড়াতে চেষ্টা করতেই পাখা পালকসহ আরো বেশি জড়িয়ে গেল। ঈগল এবার বুঝতে পারলো এই শস্যদানাগুলো শিকারীর চার আর তারই জালে এখন সে আটকা পড়েছে। ঈগল এখন চাচ্ছে শিকারী তাড়াতাড়ি এসে তাকে ধরে নিয়ে যাক, তবু কাক যেন এ অবস্থায় তাকে না দেখে। তাহলে লজ্জার সীমা থাকবে না। কিন্তু শিকারী তো জালের ধারে কাছেও নেই। সে সকালে ফাঁদ পেতে চলে যায় আর বিকেলে কাজ সেরে এসে জাল গুটিয়ে নেয়। এখন কী করবে ঈগল! এসব ভাবতে ভাবতে কাক এসে হাজির। জালে আটকে পড়া ঈগলকে দেখেই সে আশ্চর্য হয়ে গেল। কাক কী করবে না করবে ভাবছিল। সেই ফাঁকে ঈগল কাককে বললো: দেখো, এই শস্যদানাগুলোর কথাই আমি বলছিলাম তোমার বাসার পাশে বসে।

কাক তো এতোক্ষণে বুঝে ফেলেছে ঈগলের বুজরুকি। অস্ফুট স্বরে সে জবাব দিলো: কী অবাক ব্যাপার! তুমি এতো ছোটো ছোটো দানা কতোদূর থেকে দেখতে পেয়েছো! অথচ এতো বড়ো জালটা দেখতে পাও নি। সত্যিই....

ঈগল বুঝে ফেললো কাককে অতোটা বোকা মনে করা ঠিক হয় নি, সে সবই বোঝে। তাই এখন নিজের বাহাদুরি ঝেড়ে ফেলে বললো: আমাকে মাফ করে দাও! আমি আসলে মিথ্যে বলেছিলাম তোমাকে। এখন এসব বলার সময় নেই, এখান থেকে কী করে আমাকে ছাড়ানো যায় তুমি সেই চেষ্টা করো তাড়াতাড়ি ।

কাক বললো: এটাতো ইঁদুরের কাজ। শিকারী এসে পড়ার আগেই ইঁদুর খুঁজে আনতে হবে। ও খুব সহজেই জাল কেটে তোমাকে মুক্ত করে দিতে পারবে। ইঁদুরের দাঁতগুলো খুবই চিকন এবং ধারালো। কাটতেও পারে দ্রুত। জালে দাঁত লাগাবে আর তুমি ছুটে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু ইঁদুরের খোঁজ যদি না পাই, তাহলে কী হবে কে জানে......!

ঈগল বললো: সময় নষ্ট করো না। তাড়াতাড়ি যাও....

আপনাদের কী ধারণা! কাকের কথা ইঁদুর বিশ্বাস করবে তো?#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ