নভেম্বর ০৬, ২০২১ ১৮:১১ Asia/Dhaka

মহান আল্লাহর আসমাউল হুসনার অন্তর্ভুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হ'ল হাকিম।

যে ব্যক্তি সঠিক ও সবচেয়ে ভালো কথা ছাড়া অন্য কোনো কথা বলেন না এবং  সবচেয়ে ভালো পন্থায় সর্বোত্তম কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ করেন না তাঁকে বলা হয় হাকিম। তিনি অশোভনীয় ও অসমীচীন কিছু করেন না। পারিভাষিক অর্থে হাকিম হচ্ছেন তিনি যিনি সব কিছুকে তার উপযুক্ত স্থান দেন ও সঠিক বিচার-বিশ্লেষণ করেন। পবিত্র কুরআনে হাকিম ও এর সমার্থক বা সমজাতীয় শব্দ ১১০ বার দেখা যায়। মহান আল্লাহ হাকিম। তিনি সব কিছুতে পুরোপুরি পূর্ণতার অধিকারী এবং তাঁর মধ্যে কোনো ত্রুটি নেই ও ত্রুটি-বিচ্যুতির কোনো আশঙ্কাও মহান আল্লাহ সম্পর্কে প্রযোজ্য নয়। তিনি যা সৃষ্টি করেন তাতে থাকে পরিপূর্ণ ক্ষমতার প্রকাশ এবং থাকে স্থায়িত্ব ও দৃঢ়তা। কোনো ভুল কিংবা ঘাটতি বা কমতি তাঁর কাজে দেখা যায় না।  হাকিম শব্দটি এসেছে হাকামা বা হুকমুন থেকে। এর অর্থ সুরক্ষার জন্য ও জুলুম থেকে রক্ষার জন্য বাধা দেয়া। রাষ্ট্র বা শাসন-ব্যবস্থা ও বিচার-বিশ্লেষণও এর অন্য অর্থ।  হুকমুন বা হুকুম বিচারের রায় সম্পর্কিতও বটে। আর বিচার ব্যবস্থা হচ্ছে রাষ্ট্র-ব্যবস্থারও অংশ। তাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছাড়া বিচারবিভাগীয় রায় বা হুকুম দেয়া যায় না। অন্য কথায় হুকুম বলতে শাসনও বোঝায়। মহান আল্লাহ সুরা যাসিয়া'র ১৬ নম্বর আয়াতে হুকমা শব্দ প্রয়োগ করে বলেছেন: আমি বনী ইসরাঈলকে কিতাব তথা ধর্মগ্রন্থ, হুকমা বা রাজত্ব ও নবুওয়ত দান করেছিলাম এবং তাদেরকে পরিচ্ছন্ন রিজিক দিয়েছিলাম ও বিশ্ববাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম।– তাই যিনি হাকিম তিনি অত্যন্ত সতর্কতা ও দূরদর্শিতা আর সময়-সচেতনতা নিয়ে এবং কোনো ধরনের ভুল না করেই কাজ বা আচরণ করে থাকেন। তাঁর দাবির সপক্ষে থাকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও অকাট্য নানা যুক্তি।

হাকিম শব্দের পাশাপাশি হিকমাত শব্দের‍ ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। পবিত্র কুরআন ও অভিধান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুসাইন বিন মুহাম্মাদ রাগ্বিব ইস্ফাহানির মতে হিকমাত হচ্ছে জ্ঞান ও বুদ্ধি খাটিয়ে সত্য বা আল্লাহকে পাওয়া। আর মহান আল্লাহর হিকমাত বলতে বোঝায় তাঁর জ্ঞান যার আওতাধীন সব সৃষ্টি বা অস্তিত্ব এবং এসব সৃষ্টির ক্ষেত্রে রয়েছে চূড়ান্ত ক্ষমতা ও দৃঢ়তার প্রয়োগ। গাছপালা ও পাহাড় থেকে শুরু করে যা কিছুই সৃষ্টিকুলের অংশ সেসবই মহান আল্লাহর হিকমাত বা হাকিম গুণের প্রকাশ। সবক্ষেত্রে আমরা যে নিয়মের রাজত্ব দেখি তা একদিকে যেমন আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ তেমনি সেসব মহান আল্লাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞারও প্রমাণ।

সৃষ্টিকুল, জন্তু-জানোয়ার, পশুপাখি,মানুষসহ সকল প্রাণীকুল, গ্রহ-তারা এবং তাদের সৃষ্টির পেছনে মহান আল্লাহর কৌশল বা হেকমত সম্পর্কে ইমাম জাফর সাদিকের আলোচনা তুলে ধরে একটি বই লিখেছিলেন উনার এক ছাত্র, যার নাম ছিল মুফাজ্জাল বিন উমার যুউফি। এই আলোচনা তৌহিদে মুফাজ্জাল নামে বিখ্যাত।  যেমন, এই আলোচনার এক পর্যায়ে শিশুদের কান্নার উপকারিতা তুলে ধরে ইমাম বলেছেন,

 "শিশুদের মগজে এক ধরনের জলীয় পদার্থ থাকে তা থেকে গেলে তারা অন্ধত্বসহ নানা ধরনের কঠিন অসুখ ও অপূর্ণতার শিকার হবে। কান্নার ফলে শিশুদের মগজ থেকে ওই জলীয় পদার্থ গড়িয়ে পড়ে এবং এর ফলে তাদের শরীর ও চোখ ভালো থাকে। বাবা-মায়েরা মহান আল্লাহর এই হিকমাতটি জানেন না। ফলে তারা শিশুদের কান্না বন্ধ করার বা থামানোর উদ্যোগ নেন। কিন্তু তারা জানেন না যে কান্না শিশুর জন্যই লাভজনক। মহান আল্লাহর সৃষ্টির অনেক কিছুরই কল্যাণ ও কৌশল আমরা জানি না বলেই বলে থাকি যে অমুক জিনিষ কোনো কাজে আসে না। কারণ আমরা মহান আল্লাহর কৌশল সম্পর্কে সচেতন নই।"

মহান আল্লাহই হচ্ছেন প্রকৃত হাকিম। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে হাকিম বলা মানে মহান আল্লাহর হিকমাতের কিছু ছিটোফোটা তার মধ্যে আছে কিন্তু তিনি চূড়ান্ত হাকিম নন। অমুক লোকটি হাকিম মানে তিনি কাজে কর্মে বেশ সতর্ক ও দুনিয়ার নিয়ম-কানুন ও রীতি বুঝে সঠিক কাজ করেন। কিন্তু যখন বলা হয় মহান আল্লাহ হাকিম তার অর্থ হল তিনি সবচেয়ে ভালো বিধি-বিধান দিয়েছেন। আর মানুষ হাকিমের উচিত এইসব খোদায়ি বিধি-বিধান মেনে চলা। মানুষ রড, সিমেন্ট, ইট, বালু ইত্যাদি দিয়ে বাড়িঘর নির্মাণ করতে শিখেছে। কিন্তু রড, সিমেন্ট ও ইট-বালুর মধ্যে নানা ধরনের গুণ এবং সেসবের জোড়া লাগার ক্ষমতা এসব মহান আল্লাহরই দান।

ইমাম সাদিক-আ.'র মতে মানুষের জন্য আল্লাহর সবচেয়ে বড়, কল্যাণকর, দৃঢ় ও সুন্দর নেয়ামত হল হিকমাত।  মহান আল্লাহ সুরা বাকারার ২৬৯ নম্বর আয়াতে বলেছেন:

তিনি তথা আল্লাহ যাকে যোগ্য মনে করেন তাকে হিকমাত তথা বিশেষ জ্ঞান দান করেন এবং যাকে বিশেষ জ্ঞান দান করা হয়, সে প্রভুত কল্যাণকর বস্তু পায়। উপদেশ তারাই গ্রহণ করে, যারা জ্ঞানবান।  -

হাকিমদের কাজ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সুদৃঢ় এবং তারা আল্লাহর বান্দাহদেরকে আল্লাহর দিকে পথ দেখান। মহানবী (সা) হযরত আলীকে বলেছেন, আল্লাহ তাঁর বান্দাহদের মধ্য থেকে কোনো বান্দাহকে  তোমার মাধ্যমে যখন হেদায়াত করেন বা সুপথ দেখান, তা নিশ্চয়ই দিনে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব কিছুর চেয়ে তোমার জন্য বেশি বরকতময়।

একজন ইতিহাসখ্যাত সৎ হাকিম হলেন হযরত লোকমান (আ)। পবিত্র কুরআনে তার নাম দুই বার এসেছে। মহানবী (সা) বলেছেন, লোকমান নবী ছিলেন না, তবে খুবই চিন্তাশীল ব্যক্তি ছিলেন। তার ইমান ও ইয়াক্বিন ছিল উচ্চমানের। তিনি আল্লাহকে ভালবাসতেন। আর আল্লাহও তাকে ভালবাসতেন। আল্লাহ তাকে হিকমাত দান করেছিলেন।

লোকমানের উপদেশ এত উচ্চ মানের যে তা পবিত্র কুরআনে স্থান পেয়েছে এবং মহান আল্লাহ তার নাম উল্লেখ করে সেসব বর্ণনা করেছেন। ইমাম সাদিকের মতে খোদাভীতির কারণেই তিনি এইসব হিকমাত অর্জন করেছেন। ইমাম এ প্রসঙ্গে বলেছেন,  তিনি তথা লোকমান হাকিম ছিলেন সদা-সচেতন ও সুক্ষ্মদর্শী। আল্লাহকে ভয় করতেন বলে অযথা হাসতেন না ও কখনও রাগ করতেন না, কারো সঙ্গে ঠাট্টা করতেন না, পার্থিব কোনো কিছু পেলে খুশি হতেন না ও হারালেও মন খারাপ করতেন না।  তিনি শিক্ষা নিতেন ঘটনা-প্রবাহ থেকে। যা যা দিয়ে নফসকে দমন করা যায় তা তিনি শিখেছিলেন এবং সেসবকে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রবৃত্তির সঙ্গে লড়াই করতেন ও সেসবের মাধ্যমে শয়তান থেকে দূরে থাকতেন। আর এ কারণেই তিনি হিকমাত পেয়েছিলেন।

মহানবীর সাহাবি হযরত সালমানও ছিলেন লোকমানের মত। হযরত আলী তাকে লোকমানের সঙ্গে তুলনা করতেন। তিনি তার প্রশংসায় বলেছেন: বাহ বাহ সালমানের মর্যাদা! সে আমাদের আহলে বাইতের অংশ! তোমরা কোথায় সালমানের মত কাউকে পাবে যে লোকমান হাকিমের মত যে জ্ঞানের প্রথম ও শেষ জানে। সে হচ্ছে অন্তহীন দরিয়ার মত।

মহান আল্লাহ কুরআনকেও হাকিম বলেছেন। এর অর্থ কুরআন জীবন্ত ও তার রয়েছে বুদ্ধিমত্তা যে মানুষের পথ প্রদর্শক ও শিক্ষক এবং কুরআন মানুষের জন্য হিকমাতের দরজাগুলো খুলে দেয়ার মাধ্যম। কুরআন মানুষকে সরল ও সঠিক পথ দেখায়।

যখন লোকমান উপদেশচ্ছলে তার পুত্রকে বলল: হে বৎস, আল্লাহর সাথে শরীক করো না। নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরীক করা মহা অন্যায়।

হে বৎস, কোন বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় অতঃপর তা যদি থাকে প্রস্তর গর্ভে অথবা আকাশে অথবা ভূ-গর্ভে, তবে আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ গোপন ভেদ জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।

হে বৎস, নামায কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ কর এবং বিপদাপদে সবর কর। নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ। অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ০৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ