২০১৯-০৮-১২ ১৭:২১ বাংলাদেশ সময়

মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ এবং তার জন্য একনিষ্ঠ আত্মত্যাগের সবচেয়ে বড় উৎসবের নাম 'ঈদুল আজহা'। এই দিনটি খোদার প্রতি ভালোবাসাকে প্রমাণ করার দিন। এই ঈদ আমাদের শেখায় ভোগ নয়, ত্যাগেই রয়েছে আনন্দ। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রেডিও তেহরান প্রতিবছরের মতো এবারো একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানটি নিচে উপস্থাপন করা হলো:

ক) শ্রোতাবন্ধুরা! সবাইকে পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে শুরু করছি ঈদের বিশেষ আয়োজন "আনন্দধারা'য়।

খ) আচ্ছা ঈদ মোবারক তো দিলেন। কিন্তু একটা জিনিস আমার বুঝে আসে না।

ক) কী সেটা?

খ) রোজা শেষ হয়ে যাওয়ার আনন্দে না হয় সবাই খুশিতে ঈদ উদযাপন করে। কিন্তু এই ঈদে এতো আনন্দ কীসের ভাই?

গ) রশিদ ভাই! আপনি কী বলছেন এটা! রোজা শেষ হয়ে যাওয়ার আনন্দ মানে..?

খ) মানে আর না খেয়ে থাকতে হবে না ... সেই আনন্দে...

গ) হুমমম এজন্যই জিজ্ঞেস করেছি ...। আমরা আসলে জানিই না কেন আনন্দ, কেন ঈদ।

খ) বুঝতে পারলাম না ...

ক) সোহেল ভাই! একটু ভালো করে ... মানে একটু ব্যাখ্যা ট্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেন না ...

গ) জি নাসির ভাই! মনে হচ্ছে বুঝিয়ে না দিলে পেজগি লেগে যেতে পারে …

খ) হ বুঝিয়ে বলেন …

গ) প্রত্যেকটা বিষয়ই আসলে নির্ভর করে আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর।

খ) রোজা ভেঙে ফেললে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন বুঝি …

ক) দ্যাখো কাণ্ড …

গ) কী অলক্ষুণে কথা … আল্লাহ আমাদেরকে যেভাবে পুরো মাস রোজা রাখার আদেশ দিয়েছেন সেভাবে রোজা রেখে থাকলে তিনি বলেছেন নিজ হাতে পুরস্কার দেবেন।

খ) ওহ হো…. তাই বলেন। সেজন্যই তাহলে ঈদের আনন্দ …

ক) হুমমম এতোক্ষণে তাহলে বোঝা গেল। কিন্তু এই ঈদুল আজহার আনন্দ কেন … সেটা কি একটু খুলে বলা যায় ..?

গ) অবশ্যই যায়! এখানেও আল্লাহর সন্তুষ্টির বিষয়টিই আসল।

খ) এখানে আবার কীসের সন্তুষ্টি .. ঈদুল আজহাতেও কি রোজা আছে নাকি …

গ) হ্যাঁ! রোজা তো আছেই। তবে রোজার কথা বলছি না। যদিও একটি হাদিসে এসেছে আরাফাতের দিনে মানে জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখে রোজা রাখার অনেক ফযিলত রয়েছে।

ক) আপনি অন্য কোনো বিষয়ে বলতে চাচ্ছিলেন মনে হয় …

গ) জি। বলতে চেয়েছিলাম যে আল্লাহ এই দিনে আমাদের মুসলমান জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ) এবং তাঁর পুত্র হযরত ইসমায়িল (আ) এর ওপর সন্তুষ্ট হয়েছিলেন।

খ) কেন?

গ) সে এক বিরাট ইতিহাস …

ক) হোক বিরাট … আপনি আস্তে আস্তে বলেন, আমরা শুনবো …

গ) হযরত ইব্রাহিম (আ)

ক) জি … মিল্লাতা আবিকুম ইব্রাহিম, হুয়া সাম্মাকুমুল মুসলেমিন ..

গ) হুমম আমাদের মুসলমান জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ) তাঁর নবুয়্যতির জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে ব্যাপক পরীক্ষার মুখে পড়েছিলেন।

খ) এতো পরীক্ষা-টরীক্ষা কেন আবার ...

ক) বাহ ... আপনি উপরের ক্লাসে উঠবেন না? পরীক্ষা না দিলে তো ওঠা যাবে না। যারা পরীক্ষা দেয় তারাই পাস করে উপরে যায় অথবা ফেল করে আগের জায়গাতেই থেকে যায়।

খ) ওহ হো ... এটা তো খেয়াল করি নি ...

গ) সমস্যা নেই। অনেকেই খেয়াল করে না। এখনো জানে না নবীদের এতো পরীক্ষা কেন? মর্যাদার উচ্চ শ্রেণী লাভ করতে হলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। আমরা যারা জান্নাতে যেতে চাই, তাদেরকেও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। নৈলে জান্নাতে যাওয়া যাবে না। যেখানে নবীদেরকে এতো পরীক্ষা দিতে হয়েছে সেখানে বিনা পরীক্ষায় আমরা এতো সহজে জান্নাতে চলে যাবো? নাহ,যাওয়া যাবে না।

খ) আল্লাহ তুমি আমাদের পরীক্ষা উত্তীর্ণ হবার তৌফিক দিও।

ক) আমিন …

গ) আমিন … যাই হোক,বলছিলাম ইব্রাহিম (আ) এর কথা। ভয়ংকর সব পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। প্রথম পরীক্ষা ছিল অগ্নিপরীক্ষা। নমরুদ বলেছিল: ইব্রাহিম তুমি ঈমান ত্যাগ করো নৈলে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করবো। ইব্রাহিম বললেন: জীবন ত্যাগ করা যাবে কিন্তু ঈমান ছাড়া যাবে না।

খ) আল্লাহু আকবার

ক) আল্লাহু আকবার

গ) অগ্নিকুণ্ডে ফেলে দেয়া হলো ইব্রাহিম (আ) কে। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে আগুন তার কার্যকারিতা হারালো। আল্লাহ বললেন: "হে আগুন,তুমি ইবরাহিমের ওপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।"অগ্নিকুণ্ড সবুজ বাগিচায় পরিণত হয়ে গেল। পরীক্ষায় পাশ করলেন ইব্রাহিম (আ)।

খ) আর কী পরীক্ষায় পড়েছিলেন তিনি ...

গ) বলছি। ওই পরীক্ষার পরপরই ইব্রাহিম (আ) বাবা-মার ভিটেবাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন সিরিয়ার দিকে। তাঁর স্ত্রী ছিলেন সারাহ। সারাহকে সঙ্গে নিয়ে পরবাসে চলে যাবার বিষয়টিও আরেকটি পরীক্ষা।

তিনি ছিলেন নি:সন্তান। তাই সারাহ'র পরামর্শে তিনি তাঁর দাসী হাজেরাকে মুক্ত করে দিয়ে বিয়ে করেন। ইব্রাহিম (আ) আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন: হে আল্লাহ! আমাকে একটি নেককার সন্তান দান করো! আল্লাহ দোয়া কবুল করলেন এবং প্রায় ছিয়াশি বছরের বৃদ্ধ বয়সে ইব্রাহিম (আ)কে আল্লাহ এই হাজেরার গর্ভেই একটি ধৈর্যশীল শিশু সন্তানের সুসংবাদ দিলেন। এই সন্তানেরই নাম হলো ইসমায়িল।

খ) এটা তো আনন্দের কথা। পরীক্ষার কী হলো এখানে ...

গ) আরে ভাই! বলছি তো ... বৃদ্ধ বয়সে সন্তান হলে সেই সন্তানের মায়া বাবা-মা'র কাছে কেমন হয়।

খ) অনেক অনেক বেশি ...

ক) নাড়ি ছেঁড়া ধন বলে কথা ..

গ) ঠিক তাই। কিন্তু সন্তান দেয়ার পরপরই আল্লাহর নির্দেশ হলো বিচ্ছেদের। ওই নবজাতক আর তার মাকে নিয়ে রেখে আসতে হবে। কোথায়, তাও জানেন না। কিন্তু ইব্রাহিম (আ) একটিবারও জানতে চান নি: এতো বছর পর একটা সন্তান দিলে, তাকে আবার কোথায়, কেন রেখে আসতে বলছো? বলেন নি ... শুধুই নির্দেশ পালন করে গেছেন।  

খ) যে স্ত্রী এতো বছর পর একটিমাত্র সন্তান দিলো, সেই স্ত্রীর প্রতি তো ইব্রাহিম (আ) এর স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা বেড়ে যাবার কথা।

গ) হুমম বেড়ে তো গিয়েছিলই। এমন কি ওই ভালোবাসা দেখে ইব্রাহিম (আ) এর প্রথম স্ত্রী সারা পর্যন্ত কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিল।

ক) আর সে সময়ই আল্লাহ নির্দেশ দিলেন হাজেরা এবং ইসমায়িলকে সিরিয়া থেকে নিয়ে যেতে ... কী আশ্চর্য পরীক্ষা।

গ) তারচেয়েও আশ্চর্য হলো: ওই যে বললাম, ইব্রাহিম (আ) একটিবারও কী, কেন এসব জানতে চান নি আল্লাহর কাছে। জিব্রাইল (আ) বললেন: আমার সঙ্গে চলুন ... আমি যেখানে নিয়ে যাবো, সেখানেই যাবেন ...ব্যাস। হয়ে গেল। সিরিয়া থেকে পায়ে হেঁটে জিব্রাইলের সঙ্গে রওনা হয়ে বর্তমান মক্কার পাথুরে মরুতে গেলেন।

খ) তারপর?

গ) তারপর আর কী .. জিব্রাইল (আ) ইব্রাহিম (আ) কে বললেন: স্ত্রী আর আওলাদকে এখানে রেখে আপনি চলে যান।

খ) এটাও কি পরীক্ষা?

গ) নিঃসন্দেহে পরীক্ষা। এতো বছর পর যে সন্তান পেলেন তার জন্য ভালোবাসা বেশি নাকি আল্লাহর জন্য বেশি-সেটা পরীক্ষা করলেন আল্লাহ। সুতরাং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চলে গেলেন ইব্রাহিম (আ)।

ক) আচ্ছা যেখানে রেখে গেলেন স্ত্রী আর সন্তানকে সেই জায়গাটি কীরকম ছিল?

গ) ভয়াবহ পাথুরে জায়গা। এমন পাথর যেখানে কোনো গাছপালা জন্মে না। সে কারণে কেউ সেখানে বসবাস করে না। জনমানবশূন্য পাথুরে মরুভূমি। বিরানভূমি যাকে বলে আর কি!

খ) আচ্ছা! হাজেরা (সা) কিছু বলেন নি?

গ) হুমম বলেছিলেন। আপনি এ কোথায় রেখে যাচ্ছেন আমাদের। কী আছে এখানে? না পানি না খাবার না মানুষজন।

খ) কী বলেছিলেন ইব্রাহিম (আ)?

গ) তিনি পেছনে তাকান নি। তখন হাজেরা (সা) চীৎকার করে বলেছিলেন: আমাদেরকে কি আল্লাহর হুকুমে রেখে যাচ্ছেন এখানে? হাজেরা ইব্রাহিম (আ) এর ওপর ঈমান এনেছিলেন। ইব্রাহিম (আ) যে নবী এটা জানতেন তিনি। তাই এভাবে প্রশ্ন করেছিলেন।

খ) কী জবাব দিলেন তিনি?

গ) তিনি বলেছিলেন: আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপরই রেখে যাচ্ছি হাজেরা।

খ) কী প্রতিক্রিয়া দেখালেন হাজেরা (সা)?

গ) হাজেরা (সা) বলেছিলেন, আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর রেখে গেলে আল্লাহ আমাদের অবশ্যই রক্ষা করবেন।

ক) আচ্ছা! ইব্রাহিম (আ) এর কি একটু খারাপ লাগে নি? উনিও তো মানুষ ছিলেন। কীভাবে এতো পাষাণ হতে পারলেন!

গ) পাষাণ নয়। ইব্রাহিম (আ) একবার পেছনেও ফিরে তাকান নি। এর কারণ হলো, পাছে পিতৃস্নেহ উথলে না ওঠে আবার এবং পরিণামে আল্লাহর আদেশ পালনে কোন প্রকার বিচ্যুতি ঘটে না যায়।

ক) আমি এরকম একটা বর্ণনার কথা শুনেছি যে, ইব্রাহিম (আ) এর নাকি কান্না পাচ্ছিলো। কিন্তু লুকিয়েছেন কান্না। তবে তিনি একটু দূরে গিয়ে ওই শুষ্ক পাথুরে স্থান মানে বর্তমান কাবা শরিফের ভিটার দিকে ফিরে আল্লাহর কাছে তাই দোয়া করেছিলেন।

খ) কী ছিল দোয়াটি?

ক) হুমম আমি জানি। দোয়াটি সূরা ইব্রাহিমের ৩৭ নম্বর আয়াত।

খ) দোয়াটি একটু শুনলে ভালো হয় না?

গ) হুমম শোনা যাক  (সূরা ইব্রাহিমের ৩৭ নম্বর আয়াত)

ক) এর অর্থ হলো: হে আমাদের রব! আমি একটি তৃণ পানিহীন চাষাবাদের অনুপযোগী উপত্যকায় নিজের বংশধরদের একটি অংশকে তোমার পবিত্র গৃহের কাছে এনে বসবাস করিয়েছি। পরওয়ারদিগার! এটা আমি এ জন্য করেছি যে,এরা এখানে নামায কায়েম করবে। কাজেই তুমি লোকদের মনকে এদের প্রতি আকৃষ্ট করো এবং ফলফলাদি দিয়ে এদের আহারের ব্যবস্থা করো! হয়তো এরা শোকরগুজার হবে!

খ) হ্যাঁ! বুঝতে পেরেছি। ফলফলাদি, চাষাবাদের কথা বলা হয় নি।

ক) হুমম রশিদ ভাই সূক্ষ্ম বিষয়টি ধরে ফেলেছেন। বর্তমানে পৃথিবীর যেই প্রান্তে যেই ফলই হয় চলে যায় মক্কায়। ওখানে ফলফলাদির অভাব নেই। সবই পাওয়া যায়। এটা হযরত ইব্রাহিম (আ) এর দোয়ার ফল।

গ) হুমম খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের বিশ্বাসের সঙ্গে নিবীড়ভাবে সম্পৃক্ত প্রামাণ্য একটি বিষয়।

খ) আচ্ছা তারপর কী হলো?

গ) কী আর হবে। ইসমায়িল (আ) ধীরে ধীরে বেড়ে উঠলেন। বাবার হাত ধরে হাঁটার মতো বয়স হলো যখন তখন আরেক পরীক্ষার সম্মুখিন হলেন ইব্রাহিম (আ)। আনন্দের ব্যাপার হলো এই পরীক্ষাতেও তিনি অভাবনীয়রকমে উত্তীর্ণ হলেন।

খ) সুবহানাল্লাহ! আচ্ছা, এই আনন্দে আরেকবার আমরা গান শুনতে পারি না?

ক) কেন নয়, অবশ্যই .. অসমাপ্ত গানটাই না হয় শোনা যাক

ক) ঈদ মোবারক ঈদ মোবারক আজ ... তো সোহেল ভাই গান শোনার আগে আপনি ইব্রাহিম (আ) এর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার কথা বলছিলেন।

খ) হুমম … আচ্ছা, যে বয়সের কথা বলছিলেন, আমি মনে মনে ভেবে দেখলাম-এই বয়সের ছেলেমেয়েরা সাধারণত মার কাছে জানতে চায়:বাবা কোথায়, বাবা কখোন আসবে, আমার জন্য কী আনবে বাবা ইত্যাদি। মাও তখন ছেলেকে প্রবোধ দিয়ে বলে: আসবে বাবা! কদিন পরই আসবে। বাবা তোমাকে কোলে নেবে,আদর করবে,তোমার হাত ধরে কত্তো জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যাবে …

ক) হ্যাঁ! ঠিকই বলেছেন আপনি। এই বয়সের বাচ্চারা তো তাই চায়। বাবার সঙ্গে খেলতে চায়, বেড়াতে চায়। কিন্তু ইব্রাহিম (আ) কী করলেন?

গ) তিনি কোথায় ছেলেকে নিয়ে একটু বেড়াবেন। তা না। সেই যে মরুভূমিতে রেখে সামান্য পানি আর কিছু খেজুর দিয়ে চলে গেলেন,তার বেশ ক'বছর পর এসেই বললেন অন্যরকম কথা।

খ) কী কথা?

গ) বললেন: ইয়া বুনাইয়া! মানে হে প্রিয় সন্তান! আদর করে ডাকলেন। ইন্নি আরা ফিল মানাম .. মানে আমি স্বপ্নে দেখেছি- তোমাকে আমি জবাই করছি।

খ) আশ্চর্য! এতো বছর পর এসে কোথায় ছেলেকে আদর করবেন, বেড়াতে নিয়ে যাবেন, তা না। এসেছেন জবাই করতে। কী করে পারলেন ইব্রাহিম (আ) ছেলেকে একথা বলতে। সোহাগ করার পরিবর্তে এই প্রস্তাব…!!

ক) এটাই তো পরীক্ষা … তবে ইব্রাহিম (আ) ইসমায়িলের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে পরামর্শ করেছেন। অভিমত জানতে চেয়েছেন।

গ) হুমম ইসমায়িল (আ)কে জিজ্ঞেস করেছিলেন: এ ব্যাপারে তোমার অভিমত বা পরামর্শ কী? ইসমায়িল (আ) ও তো নবি এবং এখন তিনি একটু আধটু বুঝতেও শিখেছেন। তাই তাঁরও তো একটা ব্যক্তিত্ববোধ রয়েছে। সুতরাং তিনিও নবীসুলভ একেবারে হৃদয় গলানো জবাব দিলেন।

খ) কী বলেছিলেন তিনি?

গ) তিনি বলেছিলেন: হে আমার শ্রদ্ধেয় পিতা! আল্লাহ তায়ালা যেভাবে যা করার নির্দেশ দিয়েছেন আপনি তাই আমার ওপর কার্যকর করুন।

ক) একটা প্রশ্নও তো করেন নি …

গ) নাহ,কোনো প্রশ্ন করেন নি।বরং তিনি বলেছেন: "হে আব্বাজান! আপনাকে যা হুকুম দেয়া হচ্ছে তা করে ফেলুন, ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে সবরকারীদের অন্তর্ভুক্তই পাবেন।”

ক) কী অবাক কাণ্ড তাই না! স্বপ্নে দেখা ঘটনা কার্যকর করার ব্যাপারেও ইব্রাহিম (আ) এবং ইসমায়িল (আ) কতোটা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ও আন্তরিক ছিলেন। ওই যে আল্লাহ ইব্রাহিম (আ) কে একটি ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিয়েছিলেন-ফাবাশ্বারনাহু বি গুলামিন হালিম- এটাই হলো সেই ধৈর্যশীলতার প্রমাণ।

খ) জি জি! তারপর কী হলো?

গ) ইব্রাহিম (আ) পরপর তিন রাত একই স্বপ্ন দেখার পর সেটা কার্যকর করতে সন্তানকে নিয়ে রওনা হলেন মিনার দিকে।মিনার কাছে যেতেই শয়তান ইসমায়িলের কানে কানে বললো: তোমাকে কিন্তু জবাই করতে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বাবাকে বলে দিলেন। বাবা ইব্রাহিম সঙ্গে সঙ্গে বললেন: শয়তান! শয়তান!! পাথর মারো ওকে। নিজেও মারলেন, ছেলেকেও মারতে বললেন।

খ) ও ... হাজিগণ এজন্যই জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করে নাকি!

গ) এই তো, ঠিক ধরেছেন আপনি। এতো গুরুত্বপূর্ণ এই পাথর মারা যে হজ্জ কার্যক্রমে এই পাথর মারার জন্য হাজিদেরকে তিন দিন মিনায় থাকতে হয়। এ থেকেই এর গুরুত্ব বোঝা যায়। তিন দিন পাথর নিক্ষেপ করতে হয়। পাথর নিয়ে ফেলে আসলে হবে না, টার্গেট নির্ধারণ করে ছুঁড়ে মারতে হবে।

খ) আচ্ছা! ইব্রাহিম (আ) এবং ইসমায়িল (আ) এর কথা বলেন।

গ) জি ... শয়তানকে বিতাড়িত করে বাবা-ছেলে গিয়ে পৌঁছলো মিনায়। ছেলের প্রতি বাবার তো মায়া আছে। ছেলেও সেটা বোঝে। আর ছেলে জবাই হতে যাচ্ছে সেদিকে তার খেয়াল নেই। সে বরং বাবাকে বলছে: বাবা! জবাই করার সময় আমার চেহারা দেখলে তোমার মায়া হতে পারে। তাহলে আল্লাহর নির্দেশ পালনে বাধার সৃষ্টি হতে পারে। সুতরাং তুমি আমার চেহারা নিচের দিকে দিয়ে জবাই করো।

ক) সুবহানাল্লাহ! কীরকম বাপ তার কীরকম ছেলে। আল্লাহ তুমি ইব্রাহিম (আ) এবং ইসমায়িল (আ) এর ওপর রহম করো।

খ) আচ্ছা তারপর কী হলো?

গ) ফালাম্মা আসলামা ওতাল্লাহু লিল জাবিন। মানে ইবরাহীম (আ) পুত্র ইসমায়িলকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন।

খ) তারপর জবাই করলেন?

গ) ধারালো ছুরি গলায় চালালেন কিন্তু গলা কাটলো না। ইসমায়িল বাবাকে বললেন: বাবা! ছুরিটা পাথরে শান দিয়ে নেন। তিনি তাই করলেন। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। ছুরি আল্লাহর নির্দেশ পালন করলো আগুনের মতো। আগুন যেমন ইব্রাহিমকে পুড়তে পারে নি, ছুরিও তেমনি ইসমায়িলের গলা কাটতে পারে নি।

খ) পরে?

গ) পরে আর কী! আল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হলো:

ক) এবং আমি আওয়াজ দিলাম: হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়ে দিয়েছো! আমি সৎকর্মশীলদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চিতভাবেই এটি ছিল একটি প্রকাশ্য পরীক্ষা। একটি বড় কুরবানীর বিনিময়ে আমি এই শিশুটিকে ছাড়িয়ে নিলাম।

খ) দেখছেন,আল্লাহ যে দয়ালু সেটার প্রমাণ।

গ) শুধু তাই নয়,আল্লাহ ইব্রাহিম (আ) এর নির্দ্বন্দ্ব আনুগত্যে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে সালাম দিয়ে বলেছেন: আমি সৎকর্মকারীদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি।

ক) এরপর জিব্রাইল (আ)কে বললেন: দুম্বা হাজির করো। বেহেশতি দুম্বা। এটা হলো ফিদিয়া অর্থাৎ ইব্রাহিমের পুত্রের পরিবর্তে দুম্বাটি জবাই করার জন্য দেওয়া হয়েছে।

গ) হুমম একেবারেই নাদুস নুদুস এবং শিংওয়ালা। ওই দুম্বাটিকেই ইসমায়িলের পরিবর্তে কোরবানি করা হয়েছে। ঐতিহাসিক এই ঘটনাকে কেয়ামত পর্যন্ত প্রামাণ্য করে রাখার জন্যই ঈদুল আজহায় হজ্জের পর এই কোরবানির আয়োজন।

খ) ইসসসস … আমি ভাবছি অন্য কথা। যদি ইসমায়িল (আ) কে কোরবানী করা হতো, তাহলে অবস্থাটা কী হতো … আমরা সবাই আমাদের সন্তানকে জবাই করে দিতে বাধ্য হতাম। উত্তর প্রজন্ম বলতে তো আর কিছু থাকতো না।

গ) আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ভালোবাসেন। জবাই করবেন কেন? এটা তো আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। এই যে আমরা এখন কোরবানি দিই, আল্লাহ তো পশুর সাইজ দেখেন না, মূল্য দেখেন না, জবাই দেখেন না, দেখেন শুধু বান্দার অন্তর। বান্দার মনের অবস্থাটা কী, সেটাই দেখেন। মূল কোরবানী তো ওখানে, মনে।

খ) আমার একটা চিন্তা মাথায় এসেছে।

গ) বলেন, বলেন ...

খ) আমার একটা গরু আছে, বয়স হয়ে গেছে অনেক। তাছাড়া রোগাক্রান্ত। তো কোরবানি যেহেতু দিতেই হবে, ভাবছি ওই গরুটা জবাই করে দেবো। মরে গেলে তো সব গেল। কোরবানি দিলে কোরবানিও হয়ে গেল, অন্য পশু কেনার টাকাটাও বেঁচে গেল।

গ) আল্লাহর সঙ্গে চালাকি চলবে না রশিদ ভাই! কোরবানি দিতে হবে প্রিয় বস্তু। যে পশুটি সুন্দর, নাদুস নুদুস এবং আপনার প্রিয়। নিজের হাতে লালন পালন করা পশুই বেশি প্রিয় হয় আমাদের।

ক) হুমম, মূল কথা হলো এখলাস থাকতে হবে। একনিষ্ঠ ঈমান থাকতে হবে। ইন্না সালাতি ওনুসুকি ওমাহইয়ায়া ওমামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। আমার নামাজ, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ সব কিছুই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য।

গ) আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার লক্ষ্যেই মুমিনের সকল ইবাদাত হতে হবে।

খ) আচ্ছা আল্লাহ যে এতো এতো পরীক্ষায় ফেললেন ইব্রাহিম (আ)কে। তিনি তো সব পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হয়েছেন। কী পুরস্কার পেয়েছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে?

ক) দেখছেন, নগদ পুরস্কার চায় ...

গ) পেয়েছেন। আল্লাহ ইব্রাহিম (আ) কে নেতা বানিয়েছেন। এটাই পুরস্কার।

খ) কী রকম নেতা?

গ) সমগ্র মুসলিম জাতির নেতা। কুরআনে মুসলমান জাতির পিতা বলে ঘোষণা করেছেন। মিল্লাতা আবিকুম ইব্রাহিম। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে ইব্রাহিম (আ) কে পুরস্কার হিসেবে মুসলিম জাতির পিতা হিসেবে সম্মান ও মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। এটাই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি।

খ) তার মানে কুরবানি করতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আর আল্লাহ সন্তুষ্ট হলেই আনন্দ।

ক) তাহলে তো গরু কত বড় আর দামি, দুম্বা কয়টা কোরবানি করলো-এসবের কোনো গুরুত্ব নেই। গুরুত্ব হলো ত্যাগের। ত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার ঈদ-ঈদুল আজহা।

গ) ঠিক বলেছেন, আল্লাহর কাছে গুরুত্ব হলো খাঁটি ঈমান আর একনিষ্ঠতার। ঈদুল আজহার দিন সমগ্র মুসলিম জাতি ইবরাহিমি সুন্নাত পালনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রাণপণ চেষ্টা করে।

খ) আল্লাহ আমাদের সবাইকে একনিষ্ঠ ঈমানের অধিকারী করুন। তাঁর রাস্তায় প্রিয় বস্তু কোরবানি করার তৌফিক দিন।

ক+গ) আমিন।

ক) শ্রোতাবন্ধুরা! মনে রাখতে হবে, যে অকুণ্ঠ ঈমান আর ত্যাগের মহিমায় উদ্দীপ্ত হয়ে ইবরাহিম (আ) তাঁর বৃদ্ধ বয়সের প্রিয়তম পুত্রকে জবাই করতে গলায় ছুরি চালিয়েছিলেন, আপনারাও কোরবানির পশু জবাই করার সময় অন্তরাত্মায় সেই ঈমান ও ত্যাগের কথা স্মরণ করবেন, অনুভব করতে চেষ্টা করবেন। মনের ভেতর যদি সেই ঈমান ও ত্যাগের সুর অনুরণিত না হয়,আল্লাহর আদেশ-নিষেধের কাছে সর্বাবস্থায় অনুগত থাকার মানসিকতা না থাকে, তাহলে কোরবানির উৎসব হবে পিকনিক উৎসব। মনে রাখতে হবে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন: "তাদের গোশতও আল্লাহর কাছে পৌঁছে না,তাদের রক্তও না।কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছে যায় তোমাদের তাকওয়া"।

গ) এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

খ) দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে: হায়রে তাকওয়া!

ক+গ) রশিদ ভাই আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কেন?

খ) আমার একটা ঘটনার কথা মনে পড়েছে। কৌতুকমতো। নাসির ভাই সেদিন বলছিলেন।

গ) বলুন না শুনি।

ক) হুমম। বলছি: ধারালো ছুরি হাতে নিয়ে নাচাতে নাচাতে এক যুবক মসজিদে ঢুকে বললো: তোমাদের মাঝে মুসলমান কেউ আছে?

মসজিদে যে কজন মুসল্লি উপস্থিত ছিল ভয়ে আতঙ্কে সবাই বোবা হয়ে গেল। সমগ্র মসজিদে নেমে এলো আশ্চর্যরকম নীরবতা। অবশেষে শ্বেতশূভ্র দাড়িওয়ালা এক বৃদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে বললো: (রশিদ ভাই) "আমি মুসলমান"।

ছুরিধারী যুবক বুড়োর দিকে গভীরভাবে তাকালো এবং ছুরি দিয়ে ইশারা করে বললো: আমার সঙ্গে চলুন!

বুড়ো ধীর পায়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে জীবন হাতে নিয়ে যুবকের সঙ্গে চললো। কিছুদূর যাবার পর যুবক একপাল মেষ দেখিয়ে বৃদ্ধকে বললো: "এগুলো কোরবানি করে গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেবো! এ কাজে আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে"!

বৃদ্ধ এবং যুবক কাজে লেগে গেল। একের পর এক কোরবানি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেল বৃদ্ধ। যুবককে বললো: আমি আর পারছি না। মসজিদে ফিরে যাবো। তুমি অন্য কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকো!

যুবক তরতাজা রক্তময় ছুরিটি নিয়ে মসজিদে গিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করলো: তোমাদের মাঝে কি আর কোনো মুসলমান আছে?

রক্তাক্ত ছুরি দেখে উপস্থিত মুসল্লিরা ভেবেছে ওই যুবক, বৃদ্ধকে খুন করেছে। ভয়ে তারা ইমামের দিকে তাকালো। ইমাম মুসল্লিদের দিকে ফিরে বললো: (সোহেল ভাই) "কেন আমার দিকে তাকাচ্ছো? ঈসা মাসিহ'র কসম! ক'রাকাত নামাজ পড়লেই কেউ মুসলমান হয়ে যায় না"।

খ) এই যদি হয় ঈমানের অবস্থা, তাহলে আর কোরবানি করে কী হবে।

গ) আল্লাহ আমাদের মনে যথার্থ তাকওয়া দিন। আমরা যেন সর্বাবস্থায় তাঁর প্রতি একনিষ্ঠভাবে অনুগত থাকি সেটাই হোক ঈদুল আজহার প্রার্থনা।#

 

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/আশরাফুর রহমান/১২

ট্যাগ

মন্তব্য